সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো ও ভাতা নির্ধারণসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনার জন্য গঠিত ‘বেতন ও চাকরি কমিশন, ২০২৬’ এবং সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রথম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার, ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন নবম জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ গ্রেড অর্থাৎ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে, সর্বনিম্ন গ্রেড অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
বর্তমানে কার্যকর অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। আর ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা।
সে হিসাবে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুরোনো ও নতুন বেতন কাঠামোর তুলনা
| গ্রেড | অষ্টম পে-স্কেলে মূল বেতন | প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে মূল বেতন |
|---|---|---|
| প্রথম গ্রেড | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| ২০তম গ্রেড | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
প্রথম গ্রেডে মূল বেতন দ্বিগুণ হওয়ার কথা বলা হলেও ২০তম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ফলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হচ্ছে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি প্রজ্ঞাপনে কার্যকর হওয়ার এই তারিখ বহাল থাকলে চাকরিজীবীরা ওই তারিখ থেকে নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
তবে কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং হাতে বর্ধিত বেতন পাওয়ার সময় এক নাও হতে পারে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন-ভাতার অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধের পরিকল্পনা থাকতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলেও বর্ধিত অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে নাকি কয়েকটি ধাপে দেওয়া হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
বকেয়া অর্থও পর্যায়ক্রমে দেওয়ার সম্ভাবনা
কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত তারিখ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির সময় পর্যন্ত যদি কোনো ব্যবধান থাকে, তাহলে ওই সময়ের বর্ধিত বেতন ও ভাতার অর্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা সহজ রাখতে বকেয়া অর্থও পর্যায়ক্রমে পরিশোধের পরিকল্পনা করা হতে পারে।
তবে বকেয়া অর্থ এককালীন দেওয়া হবে, নাকি কিস্তিতে বা নির্দিষ্ট কয়েক ধাপে দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
প্রজ্ঞাপনের পর মিলবে পূর্ণাঙ্গ চিত্র
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
প্রজ্ঞাপনে সাধারণত যেসব বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হবে, তার মধ্যে রয়েছে—
- ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত চূড়ান্ত মূল বেতন;
- প্রতিটি গ্রেডের বেতন ধাপ ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট;
- বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতার কাঠামো;
- নতুন বেতন কার্যকরের নির্দিষ্ট তারিখ;
- বর্ধিত বেতন পরিশোধের পদ্ধতি;
- বকেয়া অর্থ প্রদানের নিয়ম;
- বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়নের নির্দেশনা।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বেতন কাঠামো, ভাতা এবং অর্থ পরিশোধের ধাপসংক্রান্ত কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এক দশকের বেশি সময় পর নতুন বেতন কাঠামো
বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ সালে কার্যকর হয়। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে একই মূল বেতন কাঠামো অনুসরণ করে আসছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এই সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ব্যয় এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
নতুন নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে বর্তমান ও প্রস্তাবিত বেতনের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে হাতে মিলবে নতুন বেতন?
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের খবরের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে—নতুন বেতন কবে থেকে হাতে পাওয়া যাবে?
এ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে সরকারি প্রজ্ঞাপনের ওপর।
কারণ কার্যকর হওয়ার তারিখ ১ জুলাই ২০২৬ ধরা হলেও বাস্তবে প্রথম মাসের বর্ধিত বেতন কবে দেওয়া হবে, সম্পূর্ণ বর্ধিত অর্থ একসঙ্গে দেওয়া হবে নাকি ধাপে ধাপে দেওয়া হবে এবং বকেয়া কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয় প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
অর্থাৎ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত পথ খুললেও সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে নতুন বেতন পৌঁছানোর পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
যা জানা গেল
নতুন পে-স্কেলের প্রধান বিষয়গুলো হলো—
- নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে।
- প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
- ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
- বর্তমানের তুলনায় বিভিন্ন গ্রেডে বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
- নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হচ্ছে।
- সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বর্ধিত বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে দেওয়া হতে পারে।
- কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে প্রাপ্য বকেয়া অর্থও পর্যায়ক্রমে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
- আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নবম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের দ্বার খুলেছে। তবে চূড়ান্ত বেতন, ভাতা, বকেয়া এবং হাতে নতুন বেতন পাওয়ার সময়সূচির জন্য এখন সবার নজর সরকারি প্রজ্ঞাপনের দিকে।

