বিবাহ ও তালাক তথ্য

এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে পড়ানো ও নিবন্ধন করা যাবে না: আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা

এফিডেভিট বা হলফনামার মাধ্যমে বিয়ে পড়ানো কিংবা বিয়ের নিবন্ধন করার সুযোগ নেই—এমন নির্দেশনা দিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কথিত ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে—এমন ধারণা আইনগতভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন ও নিবন্ধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আইন মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনার ছবিতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। নির্দেশনাটিতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের উদ্যোগে ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটারি পাবলিকের এফিডেভিট দিয়ে বিয়ে নয়

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ে পড়ানো বা নিবন্ধন করার বিষয়টি সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে অবহিত করার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো দম্পতি নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে গিয়ে শুধু একটি হলফনামা বা এফিডেভিট সম্পাদন করলেই সেটিকে আইন অনুযায়ী মুসলিম বিবাহের নিবন্ধন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এফিডেভিট নিজে কোনো বিবাহ নিবন্ধন সনদের বিকল্প নয়। নোটারি পাবলিকের সামনে কোনো ঘোষণা বা হলফনামা সম্পাদনের বিষয়টি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে বিবাহ নিবন্ধনের বিষয় এক নয়।

মুসলিম বিয়েতে কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মুসলিম আইনে বিবাহের প্রয়োজনীয় উপাদানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে—

  • বর বা কনে—যেকোনো এক পক্ষের পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব থাকতে হবে;
  • অপর পক্ষকে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে;
  • কমপক্ষে দুইজন সাক্ষী থাকতে হবে;
  • দেনমোহর থাকতে হবে।

এসবের কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে বিবাহের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—এমন বিষয়ও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব ধর্মীয় ও আইনগত উপাদান পূরণ করার পাশাপাশি বিবাহের নিবন্ধনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে মুসলিম আইনের অধীনে সম্পন্ন প্রতিটি বিবাহ নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক।

বিবাহ নিবন্ধনের দায়িত্ব কার?

Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 অনুযায়ী সরকার নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ বা লাইসেন্স প্রদান করে। আইনের ৪ ধারায় নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের বিধান রয়েছে।

আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, মুসলিম আইনের অধীনে সম্পন্ন প্রতিটি বিবাহ এই আইনের বিধান অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে।

আর বিবাহ নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজে পড়ালে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধন করবেন। অন্য কোনো ব্যক্তি বিবাহ পড়ালে বরকে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে ৩০ দিনের মধ্যে বিবাহের বিষয়টি জানাতে হবে। এরপর নিকাহ রেজিস্ট্রার তা নিবন্ধন করবেন। এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য আইনে শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।

‘কোর্ট ম্যারেজ’ নিয়ে যে ভুল ধারণা রয়েছে

বাংলাদেশে প্রচলিত ভাষায় অনেকেই নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট করাকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলে থাকেন। কিন্তু শুধু এ ধরনের হলফনামা সম্পাদন করাকে মুসলিম বিবাহের নিবন্ধনের সমতুল্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আইন ও বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন ও নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

ফলে শুধু নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট করে পরবর্তীতে দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে ওই কাগজকে বিবাহের নিবন্ধিত দলিল হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

কেন এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল?

আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিষয়টি জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে অবহিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাল্যবিবাহ ও অবৈধ বিবাহ প্রতিরোধ এবং বিবাহ-তালাকের নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে রাখা।

এ ধরনের নির্দেশনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে, কারণ সরকার বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগের বর্তমান অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনকে নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং তথ্য সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

২০২৬ সালেও সরকার বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

শুধু এফিডেভিট করে বিয়ে করলে কী করবেন?

কেউ যদি ইতোমধ্যে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে থাকেন, তাহলে শুধু ওই কাগজের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিবাহের নিবন্ধন সংক্রান্ত আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, ১৯৭৪ সালের আইনে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট। একই আইনের ৫ ধারায় বিবাহ কীভাবে রিপোর্ট ও নিবন্ধিত হবে, সেটিও নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে তালাকের ক্ষেত্রেও নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। আইনটির ৬ ধারায় মুসলিম আইনে সংঘটিত তালাক নিবন্ধনের বিষয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের পর নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে

বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আধুনিক করার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় অনলাইন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে বা সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে ফি পরিশোধের সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে।

এতে স্পষ্ট যে, বিবাহের তথ্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত ও সংরক্ষণের দিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

সতর্ক থাকার পরামর্শ

নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট সম্পাদন করাকে ‘বিয়ে রেজিস্ট্রি’ হিসেবে ধরে নেওয়া থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে বিয়ের পর সম্পত্তি, ভরণপোষণ, দেনমোহর, উত্তরাধিকার, সন্তানের আইনগত পরিচয় কিংবা দাম্পত্য অধিকার নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে নিবন্ধিত বিবাহের দলিল গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই ‘এফিডেভিট করলেই কোর্ট ম্যারেজ হয়ে যায়’—এমন ধারণার ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন ও নিবন্ধন করা উচিত।

সবশেষে বলা যায়, আইন মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের নির্দেশনার মূল বার্তা হলো—নোটারি পাবলিকের এফিডেভিটকে বিবাহ নিবন্ধনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী নিবন্ধন নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রার ও পক্ষগুলোর ওপর রয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনেও মুসলিম আইনের অধীনে সম্পন্ন প্রতিটি বিবাহ নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা বহাল রয়েছে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *