সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর গেজেটে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নতুন বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পদ ‘ব্লকড (Blocked)’ হিসেবে ঘোষিত এবং যেসব পদে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই, সেসব পদে কর্মরত স্থায়ী কর্মচারীদের জন্য সাধারণ দুই উচ্চতর গ্রেডের বাইরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন বিধান নিয়ে অনেক কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন ছিল—ব্লকড পদে কি সত্যিই চাকরিজীবনে তিনটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে? গেজেটের সংশ্লিষ্ট ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শর্ত পূরণ সাপেক্ষে উত্তরটি হ্যাঁ।
সাধারণ পদের ক্ষেত্রে দুই উচ্চতর গ্রেড
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী একই পদে পদোন্নতি ছাড়া আট বছর চাকরি পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে নবম বছরে ওই পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার যোগ্য হবেন। এই উচ্চতর গ্রেডকে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা হবে না।
এরপর প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর পদোন্নতি ছাড়া চাকরি করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে ছয় বছর পূর্তিতে পরবর্তী সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ সাধারণ পদে মূল কাঠামোটি দাঁড়ায়—
৮ বছর → ১ম উচ্চতর গ্রেড
আরও ৬ বছর → ২য় উচ্চতর গ্রেড
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—উচ্চতর গ্রেড পাওয়া মানে পদোন্নতি পাওয়া নয়; এটি মূলত বেতন-সংক্রান্ত আর্থিক সুবিধা।
ব্লকড পদে কেন তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড?
গেজেটে ব্লকড পদ ও পদোন্নতিবিহীন পদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘোষিত ব্লকড পদ এবং যেসব পদে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই, সেসব পদে কর্মরত কর্মচারী প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পরও একই পদে দীর্ঘদিন চাকরি করলে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
গেজেটের বিধান অনুযায়ী, প্রথম দুই উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে আরও আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী সপ্তম নয়, বরং নবম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হবে।
ফলে একটি ধারাবাহিক উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
ব্লকড পদের সম্ভাব্য ধাপ
চাকরির ৮ বছর পূর্তি
⬇
১ম উচ্চতর গ্রেড
প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর ৬ বছর
⬇
২য় উচ্চতর গ্রেড
দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর ৮ বছর
⬇
৩য় উচ্চতর গ্রেড
অর্থাৎ সরল হিসাবে চাকরির ধারাবাহিকতা ৮ → ১৪ → ২২ বছর হিসেবে দাঁড়ায়।
২২ বছর পূর্তিতে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বোঝা প্রয়োজন। ২২ বছর পূর্তির হিসাবটি সরাসরি চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে ২২ বছর ধরে করা নয়। বরং প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পর নির্ধারিত সময় এবং দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের পর নির্ধারিত সময়ের ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
যদি কোনো কর্মচারী কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই একই ব্লকড পদে চাকরি করেন এবং ৮ বছর পূর্তিতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পান, এরপর ছয় বছর পূর্তিতে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পান, তাহলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও আট বছর পূর্তিতে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এই কারণে সাধারণভাবে বিষয়টি ৮ বছর, ১৪ বছর এবং ২২ বছর হিসেবে বোঝানো হচ্ছে।
তবে তৃতীয় গ্রেডের ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডকে কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে অবশ্যই গেজেটে নির্ধারিত শ্রেণির পদে থাকতে হবে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
বিশেষ করে—
- পদটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘোষিত ব্লকড পদ হতে হবে, অথবা পদটিতে পদোন্নতির কোনো সুযোগ থাকতে হবে না;
- কর্মচারী একই পদে কর্মরত থাকতে হবে;
- পূর্বে নির্ধারিত প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা পূরণ করতে হবে;
- নির্ধারিত সময় পূর্ণ হতে হবে;
- চাকরি সন্তোষজনক হতে হবে;
- এবং গেজেটে নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য হবে।
চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্লকড পদের এই বিশেষ সুবিধারও একটি সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে। গেজেট অনুযায়ী, একই পদে পুরো চাকরিজীবনে উচ্চতর গ্রেডের এই সুবিধা তিনবারের বেশি পাওয়া যাবে না।
অর্থাৎ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে থেকে চতুর্থবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
এ কারণে ব্লকড পদে কর্মরত একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে কাঠামোটি মোটামুটি এমন—
| চাকরির ধাপ | উচ্চতর গ্রেড |
|---|---|
| ৮ বছর পূর্তির পর | ১ম উচ্চতর গ্রেড |
| ১৪ বছর পূর্তির পর | ২য় উচ্চতর গ্রেড |
| ২২ বছর পূর্তির পর | ৩য় উচ্চতর গ্রেড |
| এরপর | আর উচ্চতর গ্রেড নয় |
১ জুলাই ২০২৬-এর আগে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড নয়
গেজেটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্লকড বা পদোন্নতিবিহীন পদের জন্য ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড প্রদান করা হবে না। অর্থাৎ নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার আগের সময়কে ব্যবহার করে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড দাবি করার সুযোগ রাখা হয়নি।
অন্যদিকে, ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে কোনো কর্মচারীর একই পদে আট বছর পূর্ণ হলেও ১০ বছর পূর্ণ না হলে, নির্দিষ্ট শর্তে তিনি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।
‘স্বয়ংক্রিয়’ মানে কী?
গেজেটে ব্যবহৃত ‘স্বয়ংক্রিয়’ শব্দটিরও নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে কোনো অফিস আদেশ ছাড়াই বেতন নিজে থেকেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। বরং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিব বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে অফিস আদেশ জারির মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।
অর্থাৎ যোগ্যতা অর্জন হবে নির্ধারিত সময় ও শর্ত পূরণের মাধ্যমে, আর প্রশাসনিকভাবে তা অফিস আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
পদোন্নতি না থাকলেও আর্থিক অগ্রগতির সুযোগ
ব্লকড পদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—কর্মচারী একই পদে থেকে ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় পার করলেও সাংগঠনিক পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। নতুন বিধানে এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে উচ্চতর গ্রেডের মাধ্যমে বেতন কাঠামোর মধ্যে আর্থিক অগ্রগতির পথ রাখা হয়েছে।
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এ আগের মতোই ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে এবং নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, বেতনস্কেল পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
শেষ কথা
সুতরাং “ব্লকড পোস্টে চাকরিজীবনে কি তিনটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে?”—গেজেটের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, শর্ত পূরণকারী কর্মচারীর ক্ষেত্রে হ্যাঁ।
সাধারণ পদের ক্ষেত্রে যেখানে উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা সর্বোচ্চ দুইবারের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ, সেখানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘোষিত ব্লকড এবং পদোন্নতিবিহীন পদে কর্মরতদের জন্য বিশেষ বিধানে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথম দুই উচ্চতর গ্রেডের পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে আট বছর পূর্ণ হলে সন্তোষজনক চাকরির শর্তে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান কার্যকর হবে। একই পদে চাকরিজীবনে এই সুবিধা সর্বোচ্চ তিনবার।
তবে ৮–১৪–২২ বছরের হিসাবটি একটি সরল ধারাবাহিক উদাহরণ; বাস্তবে কারও উচ্চতর গ্রেডের তারিখ, পূর্বে পাওয়া টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেড/উচ্চতর গ্রেড এবং ১ জুলাই ২০২৬-এর পূর্ববর্তী চাকরিকাল বিবেচনায় ব্যক্তিভেদে প্রাপ্যতার তারিখ ভিন্ন হতে পারে।


