শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিক্ষকদের জন্য আলাদা পে-স্কেল করার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তি নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে।
এ অবস্থায় শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল’ বলতে আসলে কাদের বোঝানো হচ্ছে? শুধু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী, নাকি সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের শিক্ষক এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন?
এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ বর্তমানে শিক্ষকসমাজ একক কোনো কাঠামোর অধীনে নেই। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরাসরি সরকারি চাকরির কাঠামোর আওতায় থাকলেও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে থেকে সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতার সরকারি অংশ পেয়ে থাকেন। সরকারি নীতিমালাতেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বতন্ত্র স্কেল হলে প্রশ্ন উঠছে পরিধি নিয়ে
স্বতন্ত্র বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে—এর আওতা কতটুকু হবে। যদি এটি শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য করা হয়, তাহলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এর বাইরে থেকে যেতে পারেন।
অন্যদিকে, যদি সরকার ‘শিক্ষক’কে একটি স্বতন্ত্র পেশাগত শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের শিক্ষককে একই নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনে, তাহলে বিষয়টি হবে অনেক বেশি বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষ করে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কোন কাঠামো প্রযোজ্য হবে—এটি স্পষ্ট করা জরুরি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি হলো সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য কমানো। চলতি বছর এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা শতভাগ করার উদ্যোগের কথাও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৬ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক নীতিমালা সংশোধন ও বাস্তবায়ন হয়েছে। অর্থাৎ এমপিওভুক্ত শিক্ষকসমাজকে ঘিরে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো ইতোমধ্যেই বিদ্যমান।
তাই স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল প্রণয়নের সময় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবস্থান, বর্তমান গ্রেড, চাকরির শর্ত, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা, অবসর সুবিধা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাকে কীভাবে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সরকারি শিক্ষকরাও কি অন্তর্ভুক্ত হবেন?
এখানেই মূল আলোচনা। সরকারি শিক্ষকরা ইতোমধ্যে জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন। ফলে তাদের জন্য আলাদা শিক্ষক স্কেল করতে হলে বর্তমান জাতীয় পে-স্কেলের সঙ্গে নতুন স্কেলের সম্পর্ক কী হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো সরকারি শিক্ষক যদি বর্তমান জাতীয় পে-স্কেলে একটি নির্দিষ্ট গ্রেডে থাকেন, স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল চালু হলে তিনি নতুন স্কেলের কোন স্তরে যাবেন—এটি পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরির বিদ্যমান পদমর্যাদা, জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে নতুন স্কেল কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটিও নির্ধারণের প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ শুধু নতুন বেতন নির্ধারণ করলেই স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল সম্পূর্ণ হবে না; বরং পুরো ক্যারিয়ার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নও সামনে আসবে।
‘শিক্ষক’ বলতে সবাইকে বোঝানো হলে কী হতে পারে?
যদি সরকারের পরিকল্পনায় সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে।
সে ক্ষেত্রে—
- সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে;
- শিক্ষকদের জন্য আলাদা ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে;
- অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব হতে পারে;
- শিক্ষকতার পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে;
- মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার সুযোগ বাড়তে পারে;
- শিক্ষকতার দায়িত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর জন্য বিপুল আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন কাঠামো কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
শুধু এমপিওভুক্তদের জন্য হলে কী সমস্যা হতে পারে?
শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র স্কেল করা হলে একটি প্রশ্ন থেকেই যাবে—একই পেশায় কর্মরত সরকারি শিক্ষকরা কেন এর বাইরে থাকবেন?
আবার সরকারি শিক্ষকরা যদি নতুন স্কেলের আওতায় থাকেন কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা না থাকেন, তাহলেও বৈষম্যের অভিযোগ উঠতে পারে।
তাই ‘স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি, আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান, পদ, গ্রেড এবং সুবিধাভোগীদের তালিকা স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি
বর্তমান আলোচনায় স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হলেও এটিকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সংবাদমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বিষয়টি সরকারের আলোচনায় রয়েছে বলে ধারণা পাওয়া যায়; তবে স্বতন্ত্র স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো, কারা এতে অন্তর্ভুক্ত হবেন, কোন গ্রেডে কী বেতন হবে এবং কবে থেকে কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা বিস্তারিত সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।
শিক্ষকদের যৌক্তিক প্রত্যাশা
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তাই সবচেয়ে যৌক্তিক প্রত্যাশা হতে পারে—স্বতন্ত্র স্কেল হলে সেটি যেন কোনো নির্দিষ্ট অংশের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে এবং ‘শিক্ষক’ শব্দটির একটি সুস্পষ্ট ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়।
সরকার যদি সত্যিই শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো প্রণয়ন করতে চায়, তাহলে সরকারি ও বেসরকারি—দুই ব্যবস্থার শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
কারণ শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের অন্যতম প্রধান পেশা। তাই শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র স্কেল হলে সেটি যেন ন্যায্য, বৈষম্যহীন, টেকসই এবং সব পর্যায়ের শিক্ষকদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হয়—এটাই এখন শিক্ষকসমাজের বড় প্রত্যাশা।
শেষ কথা
‘স্বতন্ত্র শিক্ষক স্কেল’—এই একটি ঘোষণার মধ্যেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এর আওতায় কারা থাকবেন।
শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য হলে সেটি হবে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য বিশেষ বেতন কাঠামো। আর সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেটি হবে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন।
তাই এখন শিক্ষকসমাজের প্রত্যাশা একটাই—স্বতন্ত্র স্কেল হলে তা যেন শুধু নামেই স্বতন্ত্র না হয়; বরং সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের যোগ্য শিক্ষকদের জন্য ন্যায্য, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন একটি পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো হয়।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা নীতিগত নথিতে ‘শিক্ষক’ বলতে কাদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

