বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অন্যতম বড় কারণ হলো দান বা হেবা দলিল সম্পর্কে ভুল ধারণা। অনেকেই মনে করেন, শুধু স্ট্যাম্পে লিখে বা মৌখিকভাবে সম্পত্তি দান করলেই সেটি বৈধ হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, সন্তানকে দেওয়া হেবা দলিল ইচ্ছা করলেই পরে বাতিল করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে প্রচলিত আইন ও আদালতের ব্যাখ্যা এসব ধারণার অনেকটাই ভিন্ন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হেবা বা দান দলিল সম্পাদনের আগে আইনি বিধান সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এমনকি কোটি টাকার সম্পত্তি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সন্তানকে দেওয়া হেবা কি পরে বাতিল করা যায়?
অনেকের ধারণা, বাবা বা মা চাইলে যেকোনো সময় সন্তানকে দেওয়া হেবা দলিল বাতিল করতে পারেন। তবে আইনি বাস্তবতা হলো, যথাযথভাবে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর এবং সম্পত্তির দখল হস্তান্তর হয়ে গেলে রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়—যেমন সন্তান, পিতা-মাতা বা ভাই-বোনকে দেওয়া হেবা দলিল সাধারণভাবে একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না।
তবে দুটি ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে—
- দখল বাস্তবে হস্তান্তর না হলে।
- প্রতারণা, জবরদস্তি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দলিলে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে প্রমাণিত হলে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে দলিল বাতিলের আবেদন করা যায়।
শুধু স্ট্যাম্পে লিখে বা মৌখিক হেবা কি বৈধ?
অনেকেই মনে করেন, ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে বা মৌখিকভাবে হেবা করলেই সম্পত্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান আইনি ব্যবস্থায় এটি সঠিক নয়।
২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে স্থাবর সম্পত্তির দান বা হেবা দলিল বাধ্যতামূলকভাবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করতে হয়। কেবল স্ট্যাম্পে লেখা কাগজ, এফিডেভিট বা মৌখিক ঘোষণার ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি কিংবা নামজারি করা যায় না।
শর্ত দিয়ে হেবা করলে কী হবে?
অনেক ক্ষেত্রে দলিলে লেখা হয়—”আমার মৃত্যুর পর এই জমির মালিক হবে” অথবা “আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ করব”।
আইন অনুযায়ী, মুসলিম আইনে হেবা অবশ্যই তাৎক্ষণিক ও শর্তহীন হতে হবে। ভবিষ্যতে কার্যকর হওয়ার শর্তযুক্ত দান সাধারণত হেবা হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা উইল (অছিয়ত) হিসেবে গণ্য হতে পারে। আর উইলের ক্ষেত্রেও মৃত্যুর পর আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কার্যকারিতা প্রযোজ্য হয়।
একজন সন্তানকে সব সম্পত্তি দিলে অন্যরা কী করতে পারে?
জীবিত অবস্থায় একজন ব্যক্তি সুস্থ মস্তিষ্কে নিজের অর্জিত বা বৈধভাবে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো ব্যক্তিকে দান করতে পারেন।
তবে যদি মৃত্যুশয্যায় (মরজ-উল-মৌত) থেকে সম্পূর্ণ সম্পত্তি দান করা হয় অথবা মানসিক অক্ষমতা, প্রতারণা কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল সম্পাদিত হয়, তাহলে অন্যান্য উত্তরাধিকারীরা আদালতের শরণাপন্ন হয়ে দলিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
তালাক হলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দান কি বাতিল হয়?
দাম্পত্য জীবনে স্বামী বা স্ত্রীকে বৈধভাবে নিবন্ধিত হেবা বা দান সম্পন্ন হওয়ার পর কেবল বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে—এ কারণে দলিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।
যদি সম্পত্তির দখল যথাযথভাবে হস্তান্তরিত হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে কেবল তালাকের অজুহাতে সম্পত্তি ফেরত দাবি করা যায় না। তবে প্রতারণা বা জবরদস্তির অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
হেবা করার আগে যা নিশ্চিত করা জরুরি
আইনজীবীরা বলছেন, সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে শুধু দলিল রেজিস্ট্রি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরবর্তীতে নামজারি (Mutation), খতিয়ান ও অন্যান্য রেকর্ড যথাযথভাবে হালনাগাদ করা হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দলিলের ভাষা, দখল হস্তান্তরের বিষয় এবং আইনি আনুষ্ঠানিকতা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করা ভবিষ্যতের বিরোধ এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বড় একটি কারণ হলো আইন সম্পর্কে ভুল ধারণা। তাই হেবা বা দান দলিল সম্পাদনের আগে প্রচলিত আইন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং দখল হস্তান্তরের বিধান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে দলিল সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় মামলা-মোকদ্দমা ও সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
বিঃদ্রঃ এই প্রতিবেদনটি সাধারণ আইনি তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো সম্পত্তি বা বিরোধ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
