আজকের খবর ২০২৬

জমি ক্রয়ে সাবধান : বাংলাদেশে জমি কেনাবেচায় সবচেয়ে বেশি হওয়া ১০টি প্রতারণা ও বাঁচার উপায়

“জমি কেনার আগে কাগজ দেখুন, পরে টাকা দিন”—ভূমি বিশেষজ্ঞদের এই একটি পরামর্শ অবহেলা করার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে, পরিচিত মানুষ বা আত্মীয়-স্বজন ভুল করতে পারে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেখা গেছে, অধিকাংশ জমির প্রতারণাই ঘটে কোনো না কোনো আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে।

জমি কেনা মানে শুধু একটি দলিল সম্পাদন করা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা শত বছরের মালিকানার ইতিহাস ও আইনি মারপ্যাঁচ নিখুঁতভাবে তদন্ত করা। বাংলাদেশে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সাধারণত যে ১০টি জালিয়াতি বা প্রতারণা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার বিস্তারিত বিবরণ এবং এগুলো থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার উপায় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. একই জমি একাধিকবার বিক্রি প্রতারণা

প্রতারক চক্র একটি জমি একবার বিক্রি করার পর, সেই দলিলের কার্যকারিতা সরকারি রেকর্ডে ওঠার আগেই বা মূল দলিল আসার আগেই অন্য আরেকজন ক্রেতার কাছে তা পুনরায় বিক্রি করে দেয়। অনেক সময় একই জমি ২–৩ জনের কাছে বিক্রি করে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

  • বাঁচার উপায়: জমি কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে ‘তল্লাশি’ (Searching) দিয়ে দলিল যাচাই করতে হবে। সর্বশেষ সম্পাদিত দলিল এবং নামজারি (মিউটেশন) রেকর্ড পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে জমিটি অন্য কারও কাছে ইতিমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে কিনা।

২. জাল দলিল তৈরি প্রতারণা

মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও মূল দলিলের অবিকল নকল বা ভুয়া বায়া দলিল (পিঠ দলিল) বানিয়ে নিজেদের জমির আসল মালিক দাবি করে অনেক প্রতারক।

  • বাঁচার উপায়: দলিলে উল্লিখিত বায়া দলিলের নম্বর ও সাল অনুযায়ী রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে ভলিউম বইয়ের (বালাম বই) সাথে সত্যতা ও ভেতরের লেখা মিলিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া পুরনো সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস রেকর্ডের ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখা জরুরি।

৩. নামজারি (Mutation) ছাড়া জমি বিক্রি প্রতারণা

অনেক সময় বিক্রেতার নামে বৈধ দলিল থাকে, কিন্তু তিনি সরকারি রেকর্ডে নিজের নামে নামজারি বা মিউটেশন করাননি। এই সুযোগে একই জোতের জমি অন্য কেউ নামজারি করিয়ে নিতে পারে, অথবা বিক্রেতা পূর্বের কোনো ভুল খতিয়ানের সুবিধা নিয়ে প্রতারণা করতে পারেন।

  • বাঁচার উপায়: জমি কেনার আগে বিক্রেতার নামে হালনাগাদ নামজারি বা মিউটেশন খতিয়ান এবং দাখিলা (ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ) আছে কিনা তা আগে যাচাই করুন। সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিস থেকে খতিয়ানটি অনলাইনে বা সরাসরি মিলিয়ে দেখতে হবে।

৪. ওয়ারিশ গোপন করে বিক্রি প্রতারণা

যৌথ বা পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষেত্রে কোনো এক বা একাধিক উত্তরাধিকারী (ওয়ারিশ) অন্যান্য ভাই-বোন বা অংশীদারদের অংশ গোপন করে সম্পূর্ণ জমি নিজের দাবি করে বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে অন্য অংশীদারেরা মামলা করলে ক্রেতা চরম বিপাকে পড়েন।

  • বাঁচার উপায়: বিক্রেতার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ইস্যুকৃত সঠিক ‘ওয়ারিশ সনদ’ (উত্তরাধিকারী সার্টিফিকেট) সংগ্রহ করতে হবে। এছাড়া বংশলতিকা যাচাই করে সব উত্তরাধিকারীর সম্মতি ও দলিলে তাদের স্বাক্ষর নিশ্চিত করতে হবে।

৫. খাস জমি ব্যক্তিগত বলে বিক্রি প্রতারণা

সরকারি পরিত্যক্ত সম্পত্তি, বিল-ঝিল, বা সরকারের ‘খাস’ জমি ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

  • বাঁচার উপায়: খতিয়ানের ১ নং কলাম বা মালিকের কলাম ভালো করে যাচাই করতে হবে। জমিটি সরকারি কিনা তা নিশ্চিত হতে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস (তহশিল অফিস) বা এসিল্যান্ড অফিসে খোঁজ নিতে হবে এবং সর্বশেষ সেটেলমেন্ট রেকর্ড যাচাই করতে হবে।

৬. সীমানা ভুল দেখিয়ে বিক্রি প্রতারণা

কাগজপত্রে ক্রেতাকে এক দাগের (প্লটের) জমি লিখে দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে তাকে অন্য একটি অপেক্ষাকৃত কম মূল্যবান বা বিতর্কিত জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

  • বাঁচার উপায়: সরকারি অনুমোদিত মৌজা ম্যাপ (Map) সংগ্রহ করতে হবে। একজন অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ডিজিটাল সার্ভেয়ার (আমিন) দিয়ে সরজমিনে জমিটি মেপে এর চারদিকের সীমানা এবং দলিলের দাগ নম্বরের মিল নিশ্চিত করতে হবে।

৭. ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রতারণা

প্রকৃত মালিক বিদেশে থাকলে বা অসুস্থ থাকলে, তার অজান্তেই জাল ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা মোক্তারনামা তৈরি করে প্রতারক চক্র জমিটি বিক্রি করে দেয়।

  • বাঁচার উপায়: আমমোক্তারনামাটি (Power of Attorney) যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিবন্ধিত হয়েছে, সেখানে গিয়ে এর মূল বালাম বা রেকর্ড যাচাই করতে হবে। সম্ভব হলে মূল মালিকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. বন্ধকী জমি বিক্রি প্রতারণা

জমিটি ইতিমধ্যে কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির কাছে বন্ধক (Mortgage) রেখে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এই তথ্য গোপন করে ক্রেতার কাছে জমিটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাংক জমি ক্রোক করতে এলে ক্রেতা জানতে পারেন।

  • বাঁচার উপায়: জমিটি দায়মুক্ত (Encumbrance-free) কিনা তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে তল্লাশি দিয়ে নিশ্চিত হতে হবে। এছাড়া স্থানীয় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো লিয়েন (Lien) বা দায়বদ্ধতা আছে কিনা তা খোঁজ নিতে হবে।

৯. মামলা চলমান জমি বিক্রি প্রতারণা

আদালতে যে জমির মালিকানা বা সীমানা নিয়ে দেওয়ানি মামলা (Partition Suit বা Title Suit) বিচারাধীন রয়েছে, সেই তথ্য লুকিয়ে তাড়াহুড়ো করে কম দামে জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়।

  • বাঁচার উপায়: স্থানীয় ভূমি অফিস, প্রতিবেশী এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকার বা আইনজীবীর মাধ্যমে জমিটি নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা (Injunction) বা মামলা চলছে কিনা তা সতর্কতার সাথে অনুসন্ধান করতে হবে। একজন ভালো দেওয়ানি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক।

১০. ভুয়া দখল দেখিয়ে বিক্রি প্রতারণা

কাগজে-কলমে মালিকানা থাকলেও বাস্তবে জমিটি অন্য কারও অবৈধ দখলে থাকে, অথবা বিক্রেতার সেখানে কোনো দখলই থাকে না। ক্রেতা টাকা দেওয়ার পর জমিতে গিয়ে দেখেন অন্য পক্ষ লাঠিসোঁটা নিয়ে বসে আছে।

  • বাঁচার উপায়: টাকা লেনদেনের আগেই সরেজমিন জমিটি একাধিকবার পরিদর্শন করতে হবে। জমিতে নিজের মালিকানার সাইনবোর্ড বা সীমানা প্রাচীর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আশেপাশের প্রতিবেশী বা দোকানদারদের সাথে কথা বলে জমির প্রকৃত দখলদার কে, তা গোপনে নিশ্চিত হতে হবে।

বিশেষজ্ঞের শেষ কথা: জমি কেনা মানে একটি স্থায়ী সম্পদ গড়া, যেখানে জীবনের সব খাটুনির টাকা ঢেলে দেওয়া হয়। তাই শুধু অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভর করে কিংবা দালালের চটকদার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে টাকা দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। “আগে তদন্ত, পরে দস্তখত”—এই নীতি মেনে জমির প্রতিটি কাগজ খুঁটিয়ে দেখে তবেই চূড়ান্ত লেনদেনে যাওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *