আজকের খবর ২০২৬

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি উৎসব : ডিজিটাল যুগে ফিকে হচ্ছে ঈদের আনন্দ ও সম্পর্কের উষ্ণতা

এক যুগ আগেও রমজানের শেষ দশক আসার সাথে সাথেই পাড়ার লাইব্রেরি বা ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকত। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণীদের ব্যস্ততা থাকত পছন্দের ‘ঈদ কার্ড’ কেনায়। চকচকে কাগজের ওপর জরি দিয়ে লেখা “ঈদ মোবারক”, কিংবা ভেতরে নিজের হাতে লেখা দু-চার লাইনের শুভেচ্ছা বাণী আর কাঁচা হাতের কবিতা—এই ছিল বন্ধন প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। কার্ডের গায়ে সুবাস ছড়াতে অনেকেই আবার মেখে দিতেন সামান্য আতর।

অথচ সময়ের আবর্তে আজ সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবন যেমন গতিময় হয়েছে, তেমনি উৎসবের রঙেও লেগেছে কৃত্রিমতার ছোঁয়া। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই যুগে এখন আর কেউ ঈদ কার্ড কেনে না। ফেসবুকের ওয়াল কিংবা মেসেঞ্জারের ইনবক্সে একটি রেডিমেড ঈদ ফটোকার্ড বা ‘ফরোয়ার্ডেড’ মেসেজ পাঠিয়েই যেন সেরে নেওয়া হচ্ছে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। আর এর মাধ্যমেই শেষ হচ্ছে বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের এক বিশাল দায়বদ্ধতা।

ফ্রি মেসেঞ্জারের যুগেও বাড়ছে দূরত্ব বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দশক আগেও যখন মোবাইল ফোনের কলরেট চড়া ছিল এবং ব্যালেন্স রিচার্জ করাটাও একটা ঝামেলার কাজ ছিল, তখনও মানুষ ঈদের দিন বা তার পরের দিন কষ্ট করে হলেও প্রিয় বন্ধু, দূর-সম্পর্কের আত্মীয় কিংবা ফেলে আসা সহপাঠীদের ফোন দিয়ে কথা বলত। একে অপরের কণ্ঠস্বর শুনে যে আত্মিক শান্তি মিলত, তা ছিল অতুলনীয়।

অথচ আজ যখন ঘরে ঘরে ওয়াই-ফাই, মেগাবাইটের সস্তা অফার এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমোতে অডিও-ভিডিও কল করার সুযোগ রয়েছে, ঠিক তখনই মানুষ কল দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফ্রি মেসেঞ্জারের এই যুগে এখন আর বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কল দিয়ে ঈদের দিন দু-মিনিট কথা বলা হয়ে ওঠে না। কণ্ঠস্বরের সেই চেনা টান আর আবেগের জায়গাটি দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিক “থাম্বস আপ” কিংবা “হার্ট ইমোজি”।

ডিজিটাল সমাজব্যবস্থা ও সম্পর্কের ক্ষয় সমাজবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের ‘যোগাযোগ’ বাড়ালেও ‘যোগাযোগের গভীরতা’ বা ‘কানেকশন’ কমিয়ে দিয়েছে। মানুষ এখন শত শত ফেসবুক বন্ধুর মাঝেও একা। ঈদের মতো একটি পবিত্র ও আনন্দের দিনেও মানুষ উৎসবের আসল আমেজ উপভোগ করার চেয়ে, সেই উৎসবের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’ গুনতেই বেশি ব্যস্ত থাকে।

ভার্চুয়াল জগতের এই কৃত্রিম প্রাচুর্য মানুষের ভেতরের আন্তরিকতাকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করছে। টাকা খরচ করে যেখানে মানুষ আগে খোঁজ নিত, এখন ফ্রিতেও মানুষ একে অপরের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। ফলে উৎসবগুলো দিন দিন হয়ে পড়ছে যান্ত্রিক এবং সম্পর্কগুলো রূপ নিচ্ছে এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতায়।

ফিরবে কি সেই চেনা আন্তরিকতা? প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, কিন্তু প্রযুক্তির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উৎসবের দিনগুলোতে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বের হয়ে আসা উচিত। একটি টেক্সট মেসেজ বা ফটোকার্ড পাঠানোর চেয়ে, প্রিয় মানুষের কণ্ঠে “ঈদ মোবারক” শোনার আনন্দ অনেক বেশি।

ডিজিটাল যুগের এই যান্ত্রিকতা ভেঙে আমরা যদি আবার নিজ উদ্যোগে প্রিয়জনদের সাথে সরাসরি বা অন্তত কল দিয়ে কথা বলা শুরু না করি, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো উৎসবের আসল আনন্দ এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের প্রকৃত অর্থ কী—তা কোনোদিনই জানতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *