রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এখন থেকে মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে পার পেয়ে যাওয়ার দিন শেষ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিআরটিএ-এর সমন্বয়ে চালু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI চালিত ক্যামেরা ও ই-প্রসেকিউশন (E-Prosecution) সিস্টেম। এর ফলে ট্রাফিক সার্জেন্টের অনুপস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হচ্ছে আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন এবং মুহূর্তেই মালিকের ফোনে চলে যাচ্ছে জরিমানার খুদে বার্তা (SMS)।
যেভাবে কাজ করছে এই ‘ডিজিটাল সার্জেন্ট’
নতুন এই প্রযুক্তিতে রাস্তার মোড়ে বসানো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেন্সগুলো চব্বিশ ঘণ্টা সক্রিয় থাকছে। কোনো চালক লাল বাতি অমান্য করলে বা জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি থামালে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর প্লেটের ছবি তুলে নিচ্ছে। এরপর সেই নম্বরটি সরাসরি বিআরটিএ-এর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সাথে মিলিয়ে মালিকের তথ্য বের করে মামলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। এ ক্ষেত্রে অনুরোধ বা প্রভাব খাটানোর কোনো সুযোগ থাকছে না, কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি যান্ত্রিক ও স্বয়ংক্রিয়।
নজরদারিতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও পয়েন্ট
প্রাথমিকভাবে রাজধানীর শাহবাগ, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার এবং বাংলামোটরসহ ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোট ২৫টি স্মার্ট সিগন্যাল পয়েন্টে এই এআই ক্যামেরা সক্রিয় করা হয়েছে।
যেসব অপরাধে মামলা হচ্ছে সরাসরি
আগে শুধু বড় বড় অপরাধে মামলা হতো, তবে এখন এআই ক্যামেরার তীক্ষ্ণ নজরে ছোটখাটো নিয়মভঙ্গও ধরা পড়ছে:
সিগন্যাল অমান্য করা: লাল বাতি জ্বলে থাকা অবস্থায় রাস্তা পার হওয়া।
জেব্রা ক্রসিং ব্লক: পথচারীদের হাঁটার জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা।
উল্টো পথে চলা: যানজট এড়াতে উল্টো পথে গাড়ি চালানো।
নিরাপত্তা সরঞ্জাম: হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো বা সিট বেল্ট না বাঁধা।
অন্যান্য: গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং অনুমোদনহীন ভিআইপি লাইট ব্যবহার।
জরিমানার পরিমাণ ও আইনি ঝুঁকি
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ভেদে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে:
ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য: সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা।
বেপরোয়া গতি: ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
এছাড়াও হর্ন বা অন্যান্য নিয়মভঙ্গের জন্য নির্ধারিত হারে জরিমানা গুণতে হবে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, মামলা হওয়ার পর সময়মতো জরিমানা পরিশোধ না করলে গাড়ির মালিকের নামে আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু হতে পারে। এমনকি ড্রাইভারের ভুলে মামলা হলেও তার দায়ভার প্রাথমিকভাবে মালিকের ওপরই বর্তাবে।
গাড়ির মালিকদের জন্য জরুরি নির্দেশনা
পুলিশ ও বিআরটিএ-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী, ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলার তথ্য দ্রুত আপডেট হচ্ছে। তাই গাড়ি মালিকদের প্রতি বিশেষ পরামর্শ: ১. BSP পোর্টাল: অবিলম্বে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে (BSP) গিয়ে আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরটি সঠিক আছে কি না যাচাই করুন। ২. কাগজপত্র আপডেট: ইন্স্যুরেন্স বা ট্যাক্স টোকেনসহ অন্যান্য কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ থাকলে দ্রুত নবায়ন করুন, কারণ এআই ক্যামেরা ডাটাবেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্রের মামলাও দিচ্ছে।
উপসংহার: “পুলিশ নেই মানেই আইন ভাঙার সুযোগ আছে”—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। যান্ত্রিক এই ক্যামেরা কোনো আবেগ বা অনুরোধ বোঝে না। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থদণ্ড এড়াতে ট্রাফিক আইন মেনে চলাই এখন একমাত্র পথ। আপনার সচেতনতাই পারে শহরকে যানজটমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে।
