বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকদের আস্থা ও আমানতের সুরক্ষার চিত্রটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক তথ্য এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানত বা গচ্ছিত অর্থের একটি বড় অংশ দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যাংকের ওপর পুঞ্জীভূত রয়েছে। ইসলামী ও সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো বরাবরের মতোই শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকও গ্রাহক আকর্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
২০২৫ সালের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং অর্থনৈতিক পর্যালোচনার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেশের শীর্ষ আমানতধারী ব্যাংকগুলোর একটি বিস্তারিত তালিকা ও বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
আমানত সংগ্রহে শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল আমানত নিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে এককভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় আবেগ ও ব্যবসায়িক মেলবন্ধনে ব্যাংকটি আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসি। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। সরকারি বিভিন্ন বড় প্রকল্প, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখনো সোনালী ব্যাংকে তাদের অর্থ আমানত রাখতে সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করেন।
দেশের শীর্ষ আমানতধারী ব্যাংকসমূহের তালিকা (২০২৫)
| র্যাংক | ব্যাংকের নাম | আমানতের পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| ১ | ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি | ১,৮৩,০০০ কোটি |
| ২ | সোনালী ব্যাংক পিএলসি | ১,৫২,০০০ কোটি |
| ৩ | সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক | ১,৪৩,০০০ কোটি |
| ৪ | পুবালী ব্যাংক পিএলসি | ৮০,১০০ কোটি |
| ৫ | ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB) | ৭০,০০০ কোটি |
| ৬ | ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি | ৫৯,৮৪৮ কোটি |
| ৭ | সিটি ব্যাংক পিএলসি | ৫৬,৪০৪ কোটি |
| ৮ | আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি | ৫২,০০০ কোটি |
| ৯ | ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি | ৪৭,৬০৯ কোটি |
| ১০ | ব্যাংক এশিয়া পিএলসি | ৪৪,৪১২ কোটি |
| ১১ | প্রাইম ব্যাংক পিএলসি | ৩৮,০৭৮ কোটি |
| ১২ | মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (MTB) পিএলসি | ৩৩,৭৩৭ কোটি |
| ১৩ | যমুনা ব্যাংক পিএলসি | ৩৩,২৩০ কোটি |
উৎস: বিভিন্ন ব্যাংকের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জয়জয়কার ও বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থান
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ যার আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এটি স্পষ্ট করে যে দেশের ব্যাংকিং গ্রাহকদের মাঝে শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চতুর্থ অবস্থানে থাকা পুবালী ব্যাংক পিএলসি বেসরকারি খাতের প্রচলিত (Conventional) ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষ আমানত (৮০,১০০ কোটি টাকা) ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের প্রতি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থার প্রতিফলন।
প্রযুক্তি ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ের প্রভাব
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ৭০,০০০ কোটি টাকা আমানত নিয়ে পঞ্চম এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি ৫৯,৮৪৮ কোটি টাকা নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এই সাফল্যের পেছনে তাদের শক্তিশালী এটিএম নেটওয়ার্ক, ফাস্ট ট্র্যাক এবং মোবাইল ব্যাংকিং ‘রকেট’ ও দেশব্যাপী বিস্তৃত এজেন্ট ব্যাংকিং এক বিশাল ভূমিকা রেখেছে। সাধারণ খুচরা (Retail) গ্রাহকদের ছোট ছোট আমানত সংগ্রহে এই প্রযুক্তিগত সেবা দারুণ অবদান রেখেছে।
এছাড়া সিটি ব্যাংক পিএলসি (৫৬,৪০৪ কোটি টাকা), আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি (৫২,০০০ কোটি টাকা), এবং ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি (৪৭,৬০৯ কোটি টাকা) যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম স্থান অর্জন করেছে। আধুনিক সেবার মান উন্নয়ন, ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত করপোরেট সেবার কারণে এই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে।
আস্থার সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে নানা উত্থান-পতন ও তারল্য সংকট দেখা দিলেও, এই শীর্ষ তালিকাটি প্রমাণ করে যে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের মৌলিক আস্থা এখনো অটুট। ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং যমুনা ব্যাংকও তাদের আমানতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শীর্ষ ১৩-এর তালিকায় নিজেদের স্থান সুসংহত করেছে। ২০২৬ সালে এসে এই ব্যাংকগুলো আরও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহকবান্ধব সেবা চালুর মাধ্যমে আমানতের পরিমাণ আরও বাড়াতে এবং দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
