ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লাগলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র এখনো পুরোপুরি পাল্টায়নি। যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নামজারি বা মিউটেশন সম্পন্ন করতে খরচ হওয়ার কথা মাত্র ১,১৭০ টাকা, সেখানে সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত। দালাল চক্র আর অসাধু পন্থায় কাজ করানোর প্রবণতাই এই অতিরিক্ত খরচের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১১৭০ টাকার কাজ কেন ৭০০০ টাকায়?
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইনে আবেদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত খতিয়ান হাতে পাওয়া পর্যন্ত সরকারি ফি মূলত ১,১৭০ টাকা। এর মধ্যে আবেদন ফি ৭০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা, রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা এবং খতিয়ান ফি ৫০ টাকা অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যখনই কোনো সেবাগ্রহীতা নিজে আবেদন না করে অন্য কারো মাধ্যমে বা সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে কাজ করতে চান, তখনই খরচের অঙ্ক ৭ থেকে ১০ হাজারে গিয়ে ঠেকে।
সেবাগ্রহীতাদের অসচেতনতা ও অলসতা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক নাগরিকই জটিলতা এড়াতে বা সময় বাঁচাতে নিজের কাজ নিজে করতে চান না। তারা অফিসের পিয়ন বা বাহিরের দালালের হাতে নথিপত্র তুলে দেন। নিয়ম অনুযায়ী ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের কাজ হলো আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত করা এবং প্রতিবেদন (রিপোর্ট) দাখিল করা। আবেদন ফরম পূরণ, নিবন্ধন বা ফটোকপি করার কাজ তাদের নয়। অথচ মানুষ এই ছোট ছোট কাজের জন্যও অন্যদের ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত অর্থ অর্থাৎ ‘মজুরি’ বা ‘স্পিড মানি’ হিসেবে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে।
নামজারি সম্পন্ন করার সঠিক নিয়ম:
সচেতন নাগরিক ও ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুষমুক্ত সেবা পেতে নিয়ম মেনে চলার বিকল্প নেই। সঠিক পদ্ধতিতে নামজারি করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা জরুরি: ১. অনলাইন আবেদন: নির্ধারিত সরকারি পোর্টালে নিজে নির্ভুলভাবে আবেদন করুন। ২. কাগজপত্র যাচাই: শুনানির সময় সকল মূল (অরিজিনাল) কাগজপত্র সাথে নিয়ে সশরীরে উপস্থিত হোন। ৩. নির্ধারিত ফি: অতিরিক্ত কোনো লেনদেন না করে শুধুমাত্র সরকারি ফি অনলাইনে বা চালানের মাধ্যমে জমা দিন।
ক্ষোভ ও বাস্তবতা
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে আবেদন করলেও ফাইল আটকে রাখা হয়। কর্মকর্তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ‘ঘুষখোর’ তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অনেকেই বলছেন, “তদন্তের নামে হয়রানি বন্ধ না হলে ডিজিটাল ভূমি সেবার সুফল মিলবে না।”
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: নিজের কাজ অন্যকে দিয়ে করালে তাকে বাড়তি টাকা দিতেই হবে। তাই অতিরিক্ত খরচ ও হয়রানি থেকে বাঁচতে নিজে শিক্ষিত হোন, নিয়ম জানুন এবং সরাসরি সরকারি পোর্টালে আবেদন করুন। সচেতনতাই পারে ভূমি অফিসের দুর্নীতি নির্মূল করতে।
জমি খারিজ ব্যয় কি ১১৭০ টাকা?
হ্যাঁ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ই-নামজারি বা জমি খারিজের মোট ফি বর্তমানে ১১৭০ টাকা।
২০২২ সাল থেকে ভূমি মন্ত্রণালয় এই ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে আপনার আগের তথ্যে উল্লেখ করা ১২০০ টাকার বিষয়টিও ভুল নয়, কারণ অনলাইনে আবেদন করার সময় কিছু ছোটখাটো সার্ভিস চার্জ বা পেমেন্ট গেটওয়ে ফি যুক্ত হয়ে সেটি প্রায় ১২০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়।
ফি-র বিস্তারিত ব্রেকডাউন:
নিচে সরকারিভাবে নির্ধারিত ফ্যাট বা খরচের তালিকা দেওয়া হলো:
| ধাপ | ফি-র বিবরণ | টাকার পরিমাণ |
| ১. আবেদন ফি | অনলাইনে আবেদন করার সময় প্রদান করতে হয়। | ৭০ টাকা |
| ২. নোটিশ জারি ফি | আবেদন গ্রহণের পর নোটিশ জারির জন্য। | ৫০ টাকা |
| ৩. রেকর্ড সংশোধন ফি | নামজারি অনুমোদনের পর রেকর্ড পরিবর্তনের জন্য। | ১০০০ টাকা |
| ৪. খতিয়ান ফি | নতুন খতিয়ান বা পর্চা তৈরির জন্য। | ৫০ টাকা |
| সর্বমোট | ১১৭০ টাকা |
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
কখন পরিশোধ করবেন? আবেদন করার সময় প্রথমে ৭০ + ৫০ = ১২০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। বাকি ১০৫০ টাকা আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর বা শুনানির শেষে খতিয়ান পাওয়ার আগে পরিশোধ করতে হয়।
কীভাবে পরিশোধ করবেন? এটি সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক। আপনি বিকাশ, রকেট, নগদ বা উপায়-এর মতো মোবাইল ব্যাংকিং অথবা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে পারেন।
অতিরিক্ত টাকা কেন চায়? ভূমি অফিসের দালাল বা অসাধু চক্র ফাইল দ্রুত ছেড়ে দেওয়া বা প্রসেসিং করে দেওয়ার নামে ৭০০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করে। কিন্তু আপনি যদি নিজে অনলাইনে আবেদন করেন এবং শুনানির দিন সকল অরিজিনাল মূল দলিল নিয়ে হাজির হন, তবে এই ১১৭০ টাকার বেশি এক পয়সাও খরচ হওয়ার কথা নয়।
সতর্কতা: সরাসরি ক্যাশ বা নগদ টাকায় কাউকে এই ফি দেবেন না। সবসময় অনলাইন পেমেন্ট রিসিট বা ডিসিআর (DCR) সংগ্রহ করবেন।
