পৈত্রিক বা ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি কেনা মানেই এক ধরনের ঝুঁকি—যদি না আপনি সঠিক নথিপত্র যাচাই করেন। অনেক সময় দেখা যায়, বিক্রেতা তার ভাই-বোনকে না জানিয়ে কিংবা মৌখিক বণ্টনের দোহাই দিয়ে জমি বিক্রি করছেন। পরবর্তীকালে অন্য ওয়ারিশরা দাবি তুললে বিপাকে পড়েন ক্রেতা। তাই জমি কেনার আগে ৩টি বিশেষ ডকুমেন্ট যাচাই করা বাধ্যতামূলক।
১. ওয়ারিশ সনদপত্র (Succession Certificate)
জমিটি যার নামে ছিল, তিনি মারা যাওয়ার পর আইনত কারা মালিক হয়েছেন তা নিশ্চিত করে এই সনদ। এটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সিটি কর্পোরেশন বা কাউন্সিলর অফিস থেকে ইস্যু করা হয়। এখানে প্রতিটি ওয়ারিশের নাম সঠিক আছে কি না এবং কেউ বাদ পড়েছে কি না, তা গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। বিশেষ করে বোনদের অংশ ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
২. রেজিস্ট্রি করা পারিবারিক বণ্টননামা (Partition Deed)
পৈত্রিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো ‘মৌখিক বণ্টন’। আইনে মৌখিক বণ্টনের কোনো ভিত্তি নেই। আজ যিনি মৌখিকভাবে মেনে নিচ্ছেন, জমির দাম বাড়লে বা কয়েক বছর পর তিনি বা তার উত্তরাধিকারীরা সেই বণ্টন অস্বীকার করতে পারেন।
কেন এটি জরুরি: বণ্টননামা রেজিস্ট্রি করা থাকলে কার অংশে কোন জমি পড়েছে তা সুনির্দিষ্ট থাকে। এটি ছাড়া জমি কিনলে ভবিষ্যতে অন্য অংশীদাররা আপনার কেনা জমির ওপর দাবি করতে পারেন।
৩. নামজারি খতিয়ান (Mutation)
বিক্রেতা পৈত্রিক সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার পর নিজের নামে আলাদা খতিয়ান বা মিউটেশন করেছেন কি না, তা দেখতে হবে। পৈত্রিক মালিকের নামেই যদি জমি থেকে যায়, তবে বিক্রেতা ঠিক কতটুকু অংশের মালিক তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। নামজারি খতিয়ান থাকলে বোঝা যায় বিক্রেতা সরকারের রেকর্ডে মালিক হিসেবে স্বীকৃত।
কেন শুধু দখল দেখে জমি কেনা বিপজ্জনক?
অনেকেই মনে করেন, বিক্রেতা তো অনেক বছর ধরে এই জমি ভোগদখল করছেন, সুতরাং সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
বেশি অংশ বিক্রি: বিক্রেতা হয়তো যতটুকু পান, তার চেয়ে বেশি বিক্রি করে দিচ্ছেন।
ভালো পজিশন দখল: অনেক সময় দেখা যায় বিক্রেতা মৌখিকভাবে রাস্তার ধারের ভালো জমিটি দখল করে আছেন, কিন্তু দলিলে তার অংশ পেছনের দিকে। বণ্টননামা না থাকলে অন্য ভাইরা পরে সামনের জমির অংশ দাবি করলে ক্রেতা জমি ছাড়তে বাধ্য হবেন।
বোনের অংশ আত্মসাৎ: অনেক ক্ষেত্রে ভাইরা বোনদের বঞ্চিত করে জমি বিক্রি করেন। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বোনেরা সম্পত্তির অংশীদার। তারা যদি দলিলে স্বাক্ষর না করেন বা বণ্টননামায় না থাকেন, তবে যেকোনো সময় তারা মামলা করে জমি ফেরত নিতে পারেন।
ক্রেতাদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
জমি কেনার আগে শুধু বর্তমান বিক্রেতার দলিল নয়, তার আগের মালিকানা (পিঠ দলিল) এবং খতিয়ানও যাচাই করুন। বায়না করার আগে স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সতর্কবাণী: “মৌখিক ভাগ কোনো দলিল নয়।” রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা এবং ওয়ারিশ সনদ ছাড়া ওয়ারিশি সম্পত্তি কেনা মানেই ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলায় পড়ার হাতছানি।

