বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা ২০১৫ সালের ৮ হাজার টাকা থেকে তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট মহল সাধুবাদ জানালেও, এর বিপরীতে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। মুদ্রাস্ফীতির করাল গ্রাসে পিষ্ট চাকুরিজীবীরা এখন দিশেহারা, যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি সুশাসনের ওপর।
ভাতা ও মুদ্রাস্ফীতির সমীকরণ
২০১৫ সালে যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ছিল ৮ হাজার টাকা, সেখানে আজ তা ২৫ হাজার টাকা। এটি প্রায় ২১০% বৃদ্ধি। মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মিলিয়ে এই সমন্বয় নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির এই একই চাপ সরকারি কর্মকর্তাদের ওপরও সমানভাবে প্রযোজ্য। ২০১৫ সালের পর পূর্ণাঙ্গ কোনো নতুন পে-স্কেল না আসায় মধ্যম ও নিম্ন আয়ের চাকুরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে।
আর্থিক টানাপোড়েন ও দুর্নীতির ঝুঁকি
বাজার বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের দাম গড়ে ৪০-৬০% বেড়েছে। এর বিপরীতে চাকুরিজীবীদের বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট মুদ্রাস্ফীতির হারের তুলনায় নগণ্য। প্রতিবেদনে উঠে আসা কিছু ভয়াবহ তথ্য:
ঋণের বোঝা: নিম্ন ও মধ্যম সারির চাকুরিজীবীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে ব্যক্তিগত ঋণ বা ব্যাংক লোনের ওপর নির্ভরশীল। বেতন হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই ঋণের কিস্তি পরিশোধে সিংহভাগ টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
দুর্নীতির হাতছানি: সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেয়ে অনেক সৎ কর্মকর্তাও অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুর্নীতির দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে আকাশচুম্বী ব্যবধানই দুর্নীতির অন্যতম মূল অনুঘটক।
মানসিক চাপ ও দক্ষতা হ্রাস: আর্থিক দুশ্চিন্তার কারণে দাপ্তরিক কাজে মনোযোগ কমছে, যা সামগ্রিক সরকারি সেবার মানকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন কাঠামো ও দ্রব্যমূল্যের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
“যদি বেতন দিয়ে মৌলিক চাহিদা পূরণ না হয়, তবে সেখান থেকে সততা আশা করা কঠিন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি প্রজাতন্ত্রের চাকা সচল রাখা চাকুরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
উপসংহার
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা একাত্তরে লড়াই করেছিলেন, তাদের সম্মান নিশ্চিত করা হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে, আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কারিগর চাকুরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ঋণগ্রস্ত ও হতাশ এক বিশাল জনবল নিয়ে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ প্রশাসন গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেতে পারে।
