নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানা বা একখণ্ড জমি কেনা অধিকাংশ মানুষের জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ হলো ‘বায়না’ বা অগ্রিম টাকা প্রদান। সঠিক নথিপত্র যাচাই না করে তাড়াহুড়ো করে টাকা দিলে পরবর্তীতে অর্থ ও সম্পদ—উভয়ই হারানোর শঙ্কা থাকে। ভূমি বা ফ্ল্যাট কেনার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে যে নথিপত্রগুলো সংগ্রহ ও যাচাই করা অপরিহার্য, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. জমির মালিকানা ও ধারাবাহিকতা যাচাই
জমি কেনা মানে শুধু মাটি কেনা নয়, বরং ওই মাটির আইনি অধিকার কেনা। এর জন্য মালিকানার শেকল বা ‘চেইন অফ ওনারশিপ’ পরিষ্কার থাকা জরুরি।
খতিয়ানের ধারাবাহিকতা: সিএস, এসএ, আরএস এবং সর্বশেষ বিএস (বা সিটি) খতিয়ানগুলো বিক্রেতার কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। মূল মালিক থেকে বর্তমান বিক্রেতা পর্যন্ত মালিকানা কীভাবে হস্তান্তরিত হলো, তার মিল থাকা চাই।
মূল দলিল ও বায়া দলিল: বিক্রেতা যে দলিলের মাধ্যমে মালিক হয়েছেন (সাব-কবলা, দান বা বণ্টননামা), তার মূল কপি দেখতে হবে। এছাড়া আগের মালিকদের দলিলের কপি (বায়া দলিল) সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
নামজারি বা মিউটেশন: জমিটি বিক্রেতার নামে সরকারি রেকর্ডে নামজারি করা আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। বিক্রেতার নামে আলাদা ‘জোত’ না থাকলে তিনি আইনত বিক্রির অধিকার রাখেন না।
খাজনার রশিদ (দাখিলা): সর্বশেষ অর্থবছরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা আছে কি না যাচাই করুন। বকেয়া খাজনা থাকলে জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
২. ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা
ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে জমির নথিপত্রের পাশাপাশি ভবনের বৈধতা যাচাই করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন: ভবনটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিডিএ বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। অনুমোদিত নকশার কপি সংগ্রহ করুন।
আমমোক্তারনামা (Power of Attorney): ফ্ল্যাটটি যদি ডেভেলপার কোম্পানি বিক্রি করে, তবে জমির মালিক তাদের ফ্ল্যাট বিক্রির আইনগত ক্ষমতা দিয়েছেন কি না (রেজিস্ট্রার্ড আমমোক্তারনামা), তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক।
এনওসি (NOC): অনেক সময় জমি বা প্রকল্প ব্যাংক ঋণ নিয়ে তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ‘অব্যাহতি পত্র’ বা এনওসি সংগ্রহ করতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটটি দায়মুক্ত।
৩. আইনি সুরক্ষা ও আর্থিক লেনদেন
কাগজপত্র ঠিক থাকলেও কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ আপনার বিনিয়োগকে সুরক্ষিত করবে।
সরেজমিন পরিদর্শন: নথিপত্রের সাথে বাস্তবের জমির সীমানা এবং পরিমাণ ঠিক আছে কি না, তা নিজে উপস্থিত হয়ে মেপে দেখুন। পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের কাছ থেকে জমির মালিকানা নিয়ে কোনো বিরোধ আছে কি না, তা জানার চেষ্টা করুন।
মামলা সংক্রান্ত তথ্য: জমি বা ফ্ল্যাটটি নিয়ে আদালতে কোনো দেওয়ানি মামলা বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বণ্টননামা মামলা চলছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা আদালতের মাধ্যমে খোঁজ নিন।
রেজিস্ট্রার্ড বায়না চুক্তি: মৌখিক কথার ভিত্তিতে বা সাদা কাগজে সই করে অগ্রিম টাকা দেবেন না। আইনি সুরক্ষা পেতে সবসময় একটি ‘রেজিস্ট্রার্ড বায়না দলিল’ সম্পাদন করুন। এতে চুক্তির শর্ত এবং টাকা পরিশোধের প্রমাণ সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ থাকে।
উপসংহার
ভূমি ও ফ্ল্যাট কেনায় প্রতারণা এড়াতে অন্ধভাবে কাউকে বিশ্বাস করা উচিত নয়। টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ টাকার বদলে ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা চেক ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, বায়না করার আগে নথিপত্র যাচাইয়ে কিছুটা সময় ব্যয় করলে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ সারাজীবনের জন্য নিরাপদ থাকবে। প্রয়োজনে একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।
