জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ও কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম ‘জাতীয় সঞ্চয়পত্র’ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার ওপর উৎসে কর বাড়ানোর পাশাপাশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত (Tax Rebate)। এর ফলে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের ওপর করের বোঝা প্রায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের নানাদিক উঠে এসেছে। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একদিকে সাধারণ করদাতাদের কড়াকড়ি ও নতুন শর্তের বেড়াজালে বাঁধা হয়েছে, অন্যদিকে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা মূল অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।
১. সঞ্চয়পত্রে কর দ্বিগুণ, কমছে রেয়াতের সুবিধা
এতদিন সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাগরিকেরা নিরাপদ রিটার্ন এবং ট্যাক্স সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে সঞ্চয়পত্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতেন। তবে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে আগের মতো ঢালাও কর রেয়াত বা ট্যাক্স ছাড় মিলবে না। রেয়াতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ায় করদাতাদের প্রকৃত প্রদেয় করের পরিমাণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করের হার বাড়ানোর প্রস্তাব করায় গ্রাহকের পকেটে আসা প্রকৃত লাভের পরিমাণও সংকুচিত হবে।
২. সময়মতো কর দিলে প্রণোদনা, দেরিতে জরিমানা
নতুন কর সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)। করদাতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে বিশেষ ‘পুরস্কার ও শাস্তি’র বিধান রাখা হয়েছে।
প্রণোদনা: যারা নির্ধারিত সময়ের আগেই সচেতনভাবে আয়কর পরিশোধ ও রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জরিমানা: অন্যদিকে, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়সীমা পার করে দেরিতে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিলে গুনতে হবে চড়া জরিমানা ও অতিরিক্ত সুদ।
৩. কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ
অর্থনীতিতে তারল্য সংকট কাটাতে ও দেশের টাকা দেশেই ধরে রাখার স্বার্থে বাজেটে বিতর্কিত ‘কালো টাকা সাদা করার’ সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ কর বা জরিমানা দিয়ে কোনো ধরনের উৎস বা আইনি প্রশ্ন ছাড়াই অপ্রদর্শিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং নগদ অর্থ মূল ধারার অর্থনীতিতে বৈধ বা সাদা করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন বিনিয়োগকারীরা।
৪. কর না দিলে খোলা যাবে না ব্যাংক হিসাব
ব্যাংকিং খাত এবং করের আওতা (Tax Net) সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নীতিমালায়। এখন থেকে করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও যারা কর প্রদান করবেন না কিংবা যথাযথ কর সনাক্তকরণ নম্বর (TIN) বা ট্যাক্স রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হবেন, তারা দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে নতুন করে কোনো ব্যাংক হিসাব (Bank Account) খুলতে পারবেন না। এমনকি বিদ্যমান হিসাব সচল রাখার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত: > বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার বাধ্যবাধকতা এবং সময়ে কর না দিলে জরিমানার নিয়ম করের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করবে। তবে সঞ্চয়পত্রের কর রেয়াত কমানোর সিদ্ধান্তটি দেশের মধ্যবিত্ত, নারী ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঞ্চয় প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
উৎস: দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১১ জুন, ২০২৬ (প্রথম পৃষ্ঠা)
