প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আপনি হয়তো পড়াশুনা করেছেন – সব শ্রেণীর মানুষের সাথে সন্তানকে মেশার সুযোগ সৃষ্টি হবে– সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা ২০২৬
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির (SMC) নতুন কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কমিটির সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং কমিটির গঠনে অভিভাবকদের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
১২ সদস্যের নতুন পরিচালনা পর্ষদ
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি মোট ১২ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
কমিটির অন্যান্য সদস্যদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
বিদ্যোৎসাহী সদস্য: মোট ২ জন (১ জন মহিলা ও ১ জন পুরুষ)। তাদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাশ হতে হবে এবং তারা ইউএনও (UNO) বা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কর্তৃক মনোনীত হবেন।
দাতা সদস্য: ১ জন (জমিদাতা বা তাদের উত্তরাধিকারী কর্তৃক মনোনীত)।
শিক্ষক প্রতিনিধি: ২ জন। এর মধ্যে একজন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে এবং অন্যজন নিকটস্থ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক কর্তৃক মনোনীত শিক্ষক।
অভিভাবক প্রতিনিধি: ৪ জন (২ জন মহিলা ও ২ জন পুরুষ)। তারা সরাসরি অভিভাবকদের ভোটে বা মতামতের ভিত্তিতে মনোনীত হবেন।
জনপ্রতিনিধি: সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্য বা কমিশনার পদাধিকারবলে সদস্য হিসেবে থাকবেন।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি: ক্যাচমেন্ট এলাকার একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা সরকারি কর্মকর্তা, যিনি প্রধান শিক্ষক কর্তৃক মনোনীত হবেন।
সভাপতি নির্বাচনে কঠোরতা: স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক
নতুন নীতিমালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো সভাপতি পদের যোগ্যতা। এখন থেকে কমিটির সভাপতি হতে হলে ন্যূনতম স্নাতক (ডিগ্রি) বা সমমানের ডিগ্রিধারী হতে হবে। নির্বাচন পদ্ধতি: কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি এবং একজন সহ-সভাপতি নির্বাচিত হবেন। তবে এক্ষেত্রে একটি বিশেষ শর্তারোপ করা হয়েছে— প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে এই দুই পদ নির্বাচিত করতে হবে।
পরিবর্তনের প্রভাব ও উদ্দেশ্য
সংশ্লিষ্টদের মতে, সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ করায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক তদারকি আরও জোরালো হবে। এছাড়া, বিদ্যোৎসাহী সদস্যদের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম এসএসসি পাশের শর্ত রাখা হয়েছে, যা আগে অনেক ক্ষেত্রে শিথিল ছিল। এই কাঠামোর ফলে স্থানীয় রাজনীতি বা প্রভাবের চেয়ে শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং যোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নতুন কাঠামোটি মূলত তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে এবং বিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় শিক্ষিত সমাজের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
ঝড়ে পড়া সন্তানদের সাথে কেন পড়াবেন?–শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এজন্য সরকার ইতিমধ্যে শতভাগ শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করেছে। সেই সাথে শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার জন্য অর্থাৎ শিক্ষার্থী যাতে ঝরে না পড়ে সেজন্য মিড-ডে মিল, শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান সহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহন করেছেন। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবীমা আওতায় পিতা-মাতার অবর্তমানেও ঝড়ে পড়া রোধে মাসিক ৫০০ টাকা শিক্ষা সহায়তা মিলবে।
সচেতন নাগরিক হিসেবে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা থামাতে আপনার ভূমিকা কি? কোচিং এবং একাডেমিক ব্যবসায় জ্বালানি আপনি দিচ্ছেন নাতো। শিক্ষা নিয়ে একশ্রেণির মানুষ সেবার নামে ব্যবসা শুরু করেছে। দেশে প্রায় ৭০ হাজার কিন্টারগার্ডেনসহ বিভিন্ন ধরনের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান পকেট কাটা ব্যবসা করছে।
শিক্ষা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৭০ হাজারের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান বাদে অধিকাংশেরই মানসম্মত শিক্ষাদান ব্যবস্থা নেই । সরকারী বিদ্যালয়ের চেয়ে সেখানে অধিকাংশ সুযোগই অনুপস্থিত। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০০ থেকে ৩০০০ বা তারও বেশি টাকা পর্যন্ত বেতন দিতে হয়। এছাড়াও ভর্তি ফি, সেশন ফি, স্পোর্টস, শিক্ষা সফর, নোট, গাইড বিতরন সহ বিভিন্ন নামে শিক্ষার্থীদের নিকট হতে চাঁদা আদায় করা হয়। অধিকাংশ অভিভাবকের জন্য এই ব্যয় বহন করা কষ্ট সাধ্য। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এধরনের কোন টাকা দিতে হয় না। হয়তো বলবেন, “প্রাইমারীতে পড়াশুনাই তো হয় না“! আপনি আমি কোথায় পড়াশুনা করেছি? সেই প্রাইমারীতেই তো……
শিক্ষার্থীর রুচি ও সামর্থ্যের বাইরেও বেসরকারী স্কুলে সরকার নির্ধারিত বইয়ের বাইরেও অতিরিক্ত অনেক বই পড়ানো হয় এই অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা বহন করতে শিক্ষার্থীর নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়ে থাকে। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। পিটিআিইতে ১ বছরের প্রশিক্ষণ ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। বর্তমানে শিক্ষকদের বিদেশেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে উক্ত শিক্ষকগণ নবতর ধ্যান-ধারনা প্রয়োগ করে শিক্ষাদান করে থাকেন। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ এইভাবে প্রশিক্ষিত না। যদিও কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ নিজস্বভাবে প্রশিক্ষিত কিন্তু তার সংখ্যা খুবই কম।
বিদ্যালয় শুধু পড়াশুনার জন্য নয় / খেলাধুলা, মানসিক বিকাশ, আচার অনুষ্ঠান, আদব কায়দা ইত্যাদি শেখার কেন্দ্রস্থলও বটে।
সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেকটাই খোলামেলা। শিশুদের খেলার জন্য রয়েছে মাঠ। প্রত্যেক বিদ্যালয়ের ভবনই পাকা এবং আকর্ষণীয় শ্রেণিকক্ষ। আপনি মানেন আর নাই মানেন প্রাথমিকে ঘোরাফেলা ছেলেটাও দেখে দেখে অনেক কিছু শিখে ফেলে, যা রুমে আবদ্ধ স্কুল থেকে শেখা সম্ভব নয়।

ওয়াস ব্লকের আওতায় রয়েছে একতলা/দ্বিতল স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট। বিদ্যালয় রাস্তার পাশে অবস্থিত হলে তৈরি করা হচ্ছে সীমানা প্রাচীর। সরকার প্রায় সকল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর বিতরন করেছে। এসব আধুনিক এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করা হয়। অল্পকিছু বিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সুযোগ নাই।
কেন আপনি প্রাইমারিতে পড়াবেন জানেন? চলুন বিদ্যালয়ে গিয়ে নয় এখানেই জেনে নিই
- ক) অতিরিক্ত পাঠ্য বইয়ের চাপ নেই ।
- খ) বেতন দেয়ার চিন্তা নেই।
- গ) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক দ্বারা পাঠদান করা হয় ।
- ঘ) মাল্টিমিডিয়া সহযোগে পাঠদান পরিচালিত হয় । ঙ) উপবৃত্তির সুবিধা ।
- চ) বিনামূল্যে বই প্রদান করা হয় ।
- ছ) ফ্রি স্কুল ড্রেস এর ব্যবস্থা করা হয়।
- জ) শ্রেণি পাঠদানে বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করা হয় । ঝ) শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হয় না ।
- ঞ) খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা আছে । ট) নিয়মিত শ্রেণি পরিক্ষা নেওয়া হয় এবং
- মূল্যায়ন এর উপর পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে ।
- ঠ) বাংলা ইংরেজীর পাশাপাশি আরবি শেখানোর ব্যবস্থা আছে।
শিশুকালের শিক্ষাটাই কি বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়?
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেশি পড়াশুনার সময় আপনার সন্তান ঠিকই পাবেন। এটা সময়ে গিয়ে সে নিজে নিজেই পড়বে। পড়ুয়া হলে তাকে থামাতেই পাড়বেন না। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জাতীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনের সুযোগ আছে। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সুযোগ খুবই সীমিত। বর্তমানে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন ধরনের শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ পায়। সরকারী এত সুযোগ সুবিধার পরেও আমাদের দেশের অনেক সচেতন এবং বিত্তশালী অভিভাবক তাদের সন্তানদের বিভিন্ন ধরনের বেসরকারী স্কুলে পড়াচ্ছেন। অনেকে মনে করেন তাদের সন্তানের জন্য মাসে যত বেশি খরচ হবে তত তাদের মর্যাদা বাড়বে।
আয় বুঝে ব্যয় করা কি কৃপনতা?
হ্যাঁ। তাই যদি হয় তাহলে একটু কৃপন হউন না কেন? আমার দেখা অনেকেরই চেষ্টা করেন খুব ভাল বিদ্যালয়ে সন্তান পড়াবেন। সামর্থের চেয়ে বেশি ব্যয় করে বা অন্য খরচ কমিয়ে দিয়ে হলেও কষ্ট করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়াতে চেষ্টা করেন। এটি কোন ভাবে কাম্য নয়, সন্তান একটি বড় হয়ে বলবে যে, আমাকে পড়ানো বা মানুষ করা পিতা মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল। এটি স্বাভাবিক, তাই ছেলে মেয়েকে আপনি যেমন পারেন বা যেমন সমর্থ তেমনই করুন। কোন একদিন যে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে না হয়, আহা সন্তানের জন্য কত কিছু উৎসর্গ করেছি। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুযোগ-সুবিধা কম থাকা সত্তেও শুধুমাত্র সঠিক সেবা প্রদানের মাধ্যমেই তারা অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে। এক্ষেত্রে সরকারী শিক্ষকগণ এবং শিক্ষা প্রশাসনকে আরও আন্তরিক এবং সঠিভাবে তাদের সেবা প্রদান করতে হবে। তাহলেই সকল অভিভাবক তাদের সন্তানকে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাবেন। আর সেটা দেশের মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে।
সূত্র: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা
