নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার একটি বিষয় হচ্ছে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার। বর্তমানে প্রচলিত কাঠামোয় সব গ্রেডের জন্য মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বিধান থাকলেও প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোয় সেই অভিন্ন হার আর থাকছে না। উচ্চতর গ্রেডে উঠলে ইনক্রিমেন্টের হার ধাপে ধাপে কমে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
গ্রেডভেদে প্রস্তাবিত ইনক্রিমেন্ট
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে যে কাঠামো উঠে এসেছে, তাতে—
| গ্রেড | প্রস্তাবিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট |
|---|---|
| ২০–৬ | ৫% |
| ৫ম | ৪% |
| ৪র্থ | ৩.৫% |
| ৩য় | ৩.৫% |
| ২য় | ২.৭৫% |
অর্থাৎ ৬ষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ বহাল থাকলেও ৫ম গ্রেড থেকে হার কমতে শুরু করবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের বেসামরিক গ্রেডগুলোর মধ্যে ২য় গ্রেডে তা ২ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে আসবে।
কেন ৫ শতাংশের পরিবর্তে কমানো হচ্ছে?
এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন বড় পরিমাণে পুনর্নির্ধারণ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় নিম্নতম গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ প্রায় ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় একবারে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সব গ্রেডে একই ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট রাখা হলে উচ্চ বেতনের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রতি বছর টাকার অঙ্কে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হতো। তাই প্রস্তাবিত কাঠামোয় মূল বেতন যত বেশি, পরবর্তী বার্ষিক বৃদ্ধির শতাংশ তত কম—এমন একটি ধাপভিত্তিক পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে—
প্রথমত: নতুন পে-স্কেলে একবারে মূল বেতন কতটা বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত: সেই নতুন মূল বেতনের ওপর প্রতিবছর কত শতাংশ ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হবে।
এই দুই হিসাবকে একসঙ্গে না দেখলে নতুন কাঠামোর প্রকৃত প্রভাব বোঝা কঠিন।
শতাংশ কমলেও টাকার অঙ্কে ইনক্রিমেন্ট কমবে কি?
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর নতুন মূল বেতন ৫০ হাজার টাকা। ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হলে বছরে বৃদ্ধি হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
অন্যদিকে কারও মূল বেতন যদি ১ লাখ টাকা হয় এবং তাঁর ইনক্রিমেন্টের হার ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়, তাহলে বার্ষিক বৃদ্ধি হবে ২ হাজার ৭৫০ টাকা।
অর্থাৎ শতাংশের হার কম হলেও বেশি মূল বেতনের কারণে প্রকৃত টাকার ইনক্রিমেন্ট সবসময় কম হবে—এমন নয়।
এ কারণে নতুন পে-স্কেলের প্রভাব বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু ‘৫ শতাংশ বনাম ২.৭৫ শতাংশ’ তুলনা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নতুন মূল বেতন, ইনক্রিমেন্টের টাকা, পরবর্তী ইনক্রিমেন্টের ওপর আগের ইনক্রিমেন্টের প্রভাব এবং অবসরকালীন সুবিধা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
উচ্চ গ্রেডে ইনক্রিমেন্ট কমানোর আরেকটি দিক
বর্তমান জাতীয় বেতন কাঠামোতে সবার জন্য একই ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবে সেই অভিন্ন হার ভেঙে গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে নিচের ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫ শতাংশ হার ধরে রাখতে পারবেন। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার পর ইনক্রিমেন্টের শতাংশ কমে যাবে।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় পদ যত ওপরে, বার্ষিক শতাংশভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির হার তত কম—এই নীতি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
৯ম গ্রেডে কী হবে?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রকাশিত প্রস্তাব অনুযায়ী ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে। ফলে ৯ম গ্রেডে কর্মরতদের জন্য প্রস্তাবিত হার ৫ শতাংশই থাকবে।
অর্থাৎ ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘৫ শতাংশের নিচে ইনক্রিমেন্ট’—এই পরিবর্তনটি প্রযোজ্য হচ্ছে না। মূল পরিবর্তনটি শুরু হচ্ছে ৫ম গ্রেড থেকে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘উচ্চ গ্রেডে ইনক্রিমেন্ট কমছে’—এই খবর দেখে অনেকেই ধরে নিচ্ছেন যে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ইনক্রিমেন্ট কমে যাচ্ছে। বাস্তবে প্রকাশিত প্রস্তাব অনুযায়ী তা নয়।
বিশেষ প্রণোদনার সঙ্গে ইনক্রিমেন্টের সম্পর্ক
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো বিশেষ প্রণোদনা/বিশেষ সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব। ২০২৪ সালে এই সুবিধা মূল বেতনের ৫ শতাংশ দিয়ে শুরু হয়ে পরে ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সেটি আর থাকবে না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ফলে একজন সরকারি চাকরিজীবীর প্রকৃত আয় বিশ্লেষণের সময় শুধু ইনক্রিমেন্টের হার দেখলে হবে না। নতুন মূল বেতন কত হচ্ছে, বিশেষ সুবিধা থাকছে কি না এবং অন্যান্য ভাতার হার কী হচ্ছে—এসব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাড়িভাড়া ভাতাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব
ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হারও পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা, মোবাইলসহ কিছু সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাবের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
ফলে নতুন পে-স্কেলে কার আয় কতটা বাড়বে, সেটি নির্ধারণ হবে মূল বেতন + বাড়িভাড়া + চিকিৎসা + অন্যান্য ভাতা + ইনক্রিমেন্ট + বিশেষ সুবিধা বাতিল—সবকিছুর সম্মিলিত হিসাবে।
পুরোনো ৫ শতাংশ ব্যবস্থার সঙ্গে পার্থক্য
বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে সহজ বৈশিষ্ট্য হলো—গ্রেডভেদে আলাদা ইনক্রিমেন্ট হার না রেখে ৫ শতাংশের অভিন্ন কাঠামো।
নতুন প্রস্তাবে সেই জায়গায় তৈরি হচ্ছে একটি graduated increment system।
এর ফলে—
- ২০–৬ গ্রেড: ৫%
- ৫ম গ্রেড: ৪%
- ৪র্থ ও ৩য় গ্রেড: ৩.৫%
- ২য় গ্রেড: ২.৭৫%
এই পরিবর্তন মূলত উচ্চ বেতনভোগীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক শতাংশভিত্তিক বেতন বৃদ্ধিকে ধীরে আনার একটি কাঠামো তৈরি করছে।
শুধু বেসামরিক চাকরিতে নয়
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একই ধরনের নীতি সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও সমপর্যায়ের এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পর্যায়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপর্যায়ে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, এটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো ক্যাডার বা বেসামরিক দপ্তরের জন্য আলাদা সিদ্ধান্ত নয়; বরং উচ্চ বেতন স্তরে ইনক্রিমেন্টের হার কমিয়ে আনার একটি বিস্তৃত কাঠামোগত নীতি হিসেবে প্রস্তাবটি তৈরি হয়েছে।
তাহলে ৫ শতাংশের নিচে নামানোর মূল বার্তা কী?
পুরো বিষয়টি সহজ ভাষায় বললে, নতুন পে-স্কেলে প্রথম ধাপে মূল বেতন বড় করা এবং পরবর্তী ধাপে উচ্চ বেতন স্তরে বার্ষিক বৃদ্ধির শতাংশ ধীরে রাখা—এই দুই পদ্ধতিকে একসঙ্গে নেওয়া হচ্ছে।
তাই ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শুনে মনে হতে পারে উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্ট খুব কমে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে তাঁদের নতুন মূল বেতন কত নির্ধারণ করা হচ্ছে তার ওপর।
অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকায় এই স্তরের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির প্রচলিত হার বজায় থাকবে বলে প্রস্তাবিত কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে।
শেষ কথা
২০২৬ সালের প্রস্তাবিত পে-স্কেলে ৫ শতাংশের নিচে ইনক্রিমেন্ট নামানো হচ্ছে মূলত গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির নীতি চালুর কারণে। উচ্চ গ্রেডে মূল বেতন বেশি হওয়ায় সেখানে একই ৫ শতাংশ হার না রেখে ৪%, ৩.৫% এবং সর্বশেষ ২.৭৫% পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এটি এখনো প্রস্তাবিত কাঠামো হিসেবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ। চূড়ান্ত সরকারি গেজেটে যদি হার, ধাপ বা কার্যকর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে, তাহলে সেটিই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইনক্রিমেন্টের শতাংশ কমেছে মানেই বেতন বৃদ্ধির টাকার অঙ্ক কমেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। নতুন মূল বেতন কত হচ্ছে, সেটিই পুরো হিসাবের ভিত্তি।

