বিবাহ ও তালাক তথ্য

কখন স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার হারান? যা বলছে বাংলাদেশের আইন ও শরিয়াহ

বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আইন এবং ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর ভরণপোষণ বা খোরপোশ নিশ্চিত করা স্বামীর জন্য একটি আইনি ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। তবে এই অধিকার সব সময় নিরঙ্কুশ নয়। কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রী এই অধিকার হারাতে পারেন। সম্প্রতি প্রকাশিতব্য গ্রন্থ “যখন বিশ্বাস ভাঙে: আইনি পথ ও প্রতিকার”-এর তথ্যের আলোকে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, ভরণপোষণ কেবল তখনই বাধ্যতামূলক যখন স্ত্রী তার দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ইচ্ছুক থাকেন। নিচে এমন ৬টি পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো যখন স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন:

১. স্ত্রীর অবাধ্যতা (নুশুজ)

যদি কোনো স্ত্রী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই স্বামীর অবাধ্য হন কিংবা স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি ভরণপোষণের অধিকার হারান। আইন অনুযায়ী, স্বামী যদি বসবাসের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করেন এবং এরপরও স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীর ঘর ত্যাগ করেন, তবে স্বামী তাকে খোরপোশ দিতে বাধ্য নন।

২. বিনা কারণে পৃথক বসবাস

স্বামী যদি সংসার টিকিয়ে রাখতে আন্তরিক হন এবং স্ত্রীকে নিজের সাথে রাখতে চান, কিন্তু স্ত্রী যদি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই (যেমন: স্বামীর নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতন ব্যতীত) নিজের জেদ বা ব্যক্তিগত কারণে আলাদা থাকেন, তবে তিনি ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন না। তবে মনে রাখতে হবে, স্বামী যদি মারধর বা নিষ্ঠুর আচরণ করেন, তবে স্ত্রী আলাদা থাকলেও খোরপোশ পাবেন।

৩. ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হওয়া

বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক কার্যকর হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (সাধারণত ৯০ দিন বা ৩ মাস এবং গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত) স্বামী খোরপোশ দিতে বাধ্য থাকেন। এই সময়কালকে ‘ইদ্দত’ বলা হয়। ইদ্দতকাল পার হয়ে গেলে প্রাক্তন স্বামী আর ভরণপোষণ দিতে আইনত দায়বদ্ধ থাকেন না।

৪. স্ত্রীর পুনরায় বিবাহ

তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী যদি পুনরায় অন্য কাউকে বিবাহ করেন, তবে বিবাহের দিন থেকেই তিনি তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার হারাবেন। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর পুনর্বিবাহ হলেও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবাকেই চালিয়ে যেতে হবে।

৫. কারাদণ্ড বা আইনগত অবরোধ

যদি স্ত্রী কোনো ফৌজদারি অপরাধে জেলহাজতে থাকেন বা অন্য কোনো আইনগত কারণে স্বামীর আওতার বাইরে থাকেন—যেখানে স্বামী তার প্রতি দাম্পত্য দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না—তবে সেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন।

৬. অবৈধ বিবাহ (Void Marriage)

যদি কোনো বিয়ে শুরু থেকেই আইনগত বা ধর্মীয় কারণে বাতিল বা অবৈধ বলে গণ্য হয়, তবে সেক্ষেত্রে নারী আইনত স্ত্রীর মর্যাদা পান না এবং ফলস্বরূপ ভরণপোষণ দাবি করার কোনো ভিত্তি থাকে না।


আইনি পরামর্শ: > পারিবারিক কলহ বা অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে আইন ও শরিয়াহর এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো জানা থাকলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে ভরণপোষণ ও দেনমোহর সংক্রান্ত জটিলতায় বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র: “যখন বিশ্বাস ভাঙে: আইনি পথ ও প্রতিকার” গ্রন্থ হতে সংগৃহীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *