সংসারের এগারোটি বছর পার করার পর হঠাৎ একদিন দরজায় এসে দাঁড়ালেন অন্য এক নারী, দাবি করলেন তিনি আপনার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। হাতে বিয়ের কাবিননামা, ছবি এবং ভিডিও। মুহূর্তেই যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সাজানো সংসার। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন এক ভুক্তভোগী নারী, যিনি সম্প্রতি আইনি পরামর্শের জন্য শরণাপন্ন হয়েছিলেন এক আইনজীবীর। অবুঝ দুটি সন্তান আর সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে তিনি এখন দিশেহারা—ক্ষমা করবেন, নাকি আইনি লড়াইয়ে নামবেন?
আমাদের সমাজে অনেক পুরুষই মনে করেন, মুসলিম আইনে চার বিয়ের অনুমতি থাকায় তারা চাইলেই প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বলছে ভিন্ন কথা। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মুসলিম পারিবারিক আইন যা বলছে
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় পুনরায় বিয়ে করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে:
সালিসি পরিষদের অনুমতি: স্বামীকে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে গঠিত ‘সালিসি পরিষদ’-এর কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে।
যুক্তিসঙ্গত কারণ: সালিসি পরিষদ যদি মনে করে যে দ্বিতীয় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা ও যুক্তি রয়েছে, তবেই তারা লিখিত অনুমতি প্রদান করবে।
অনুমতি ছাড়া বিয়ের পরিণাম
যদি কোনো ব্যক্তি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ব্যতীত দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি আইনি জটিলতায় পড়বেন:
১. কারাদণ্ড ও জরিমানা: আইন অমান্য করে বিয়ে করলে স্বামী অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এর জন্য তার এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
২. দেনমোহর পরিশোধ: দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর (বকেয়া থাকলে) তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। স্ত্রী চাইলে পারিবারিক আদালতে মামলা করে এই অর্থ আদায় করতে পারেন।
৩. পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণ: দ্বিতীয় বিয়ের পর স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে থাকতে না চান, তবে তিনি পৃথক থেকেও স্বামীর কাছ থেকে নিয়মিত ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন।
৪. তালাকের অধিকার: স্বামীর এই বিশ্বাসঘাতকতাকে ভিত্তি করে স্ত্রী তালাক (তালাকে তফউইজ) কার্যকর করতে পারেন এবং দেনমোহর ও খোরপোশ দাবি করতে পারেন।
অন্যান্য ধর্মে আইনি অবস্থান
বাংলাদেশে ধর্মভেদে বিয়ের আইন ভিন্ন। হিন্দু আইনে বহুবিবাহের ওপর সরাসরি আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও আধুনিক যুগে এটি সামাজিকভাবে অত্যন্ত নিরুৎসাহিত। অন্যদিকে, খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ ধর্মে একপত্নী বিবাহই একমাত্র স্বীকৃত নিয়ম; প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করা সেখানে ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ।
ভুক্তভোগী নারীর করণীয়
যদি আপনি জানতে পারেন আপনার স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, তবে ভেঙে না পড়ে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন:
প্রমাণ সংগ্রহ: স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামার প্রতিলিপি, ছবি বা সামাজিক অনুষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করুন। এটি মামলায় বড় প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
আইনজীবীর পরামর্শ: দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে কথা বলে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিন।
মানসিক দৃঢ়তা: মনে রাখবেন, আপনার নীরবতা অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করবে। নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আইনি সুরক্ষা গ্রহণ করা আপনার নাগরিক অধিকার।
বিশেষজ্ঞের অভিমত: আইনজীবীদের মতে, “বিয়ের বৈধতা থাকলেও অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। অনেক নারী লোকলজ্জার ভয়ে চুপ থাকেন, যা তাদের অধিকার বঞ্চিত করে। আইনের আশ্রয় নিলে একদিকে যেমন বিচার পাওয়া সম্ভব, অন্যদিকে স্বামীকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।”
পরিশেষে, একটি সুস্থ সমাজ গঠনে পারিবারিক বিশ্বস্ততা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা অপরিহার্য। গোপন বিয়ে কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সাজানো পরিবারের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তাই সচেতন হওয়াই হোক প্রথম প্রতিবাদ।
