ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বা ফরায়েজ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, পরিবারের সদস্যরা পারস্পরিক সমঝোতা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করতে পারেন। তবে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী উত্তরাধিকার বণ্টন একটি সুস্পষ্ট ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া, যেখানে প্রথমে নির্ধারণ করা হয় কারা আইনগতভাবে উত্তরাধিকারী এবং এরপর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তির অংশ হিসাব করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবারের প্রত্যেক বৈধ উত্তরাধিকারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে বিরোধ কমানো।
উত্তরাধিকারীদের তিনটি প্রধান শ্রেণি
ইসলামী ফরায়েজ আইনে সাধারণত উত্তরাধিকারীদের তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
নির্ধারিত অংশীদার (Qur’anic Heirs)
এই শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের অংশ পবিত্র কোরআনে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন স্বামী, স্ত্রী, পিতা, মাতা, কন্যা, পুত্রের কন্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে দাদী বা নানী।
তবে প্রত্যেকের অংশ সব সময় একরকম থাকে না। মৃত ব্যক্তির সন্তান আছে কি না, বাবা-মা জীবিত আছেন কি না বা অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে তাদের প্রাপ্য অংশ পরিবর্তিত হতে পারে।
অবশিষ্টভোগী (আসাবা)
নির্ধারিত অংশীদারদের অংশ বণ্টনের পর সম্পত্তির যে অংশ অবশিষ্ট থাকে, তা অবশিষ্টভোগীরা পেয়ে থাকেন। সাধারণত পুত্র, পুত্রের পুত্র, ভাই এবং চাচা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে পুত্ররা অবশিষ্ট সম্পত্তির প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হন।
দূরবর্তী আত্মীয় (Distant Kindred)
যদি নির্ধারিত অংশীদার এবং অবশিষ্টভোগী—উভয় শ্রেণির উত্তরাধিকারী অনুপস্থিত থাকেন, তখন দূরবর্তী আত্মীয়রা উত্তরাধিকার লাভের অধিকারী হতে পারেন। বাস্তব জীবনের অধিকাংশ সাধারণ ক্ষেত্রে এ ধরনের উত্তরাধিকার নির্ধারণ তুলনামূলক কম দেখা যায়।
স্বামী-স্ত্রী ও বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষিত
ফরায়েজ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, বৈধ উত্তরাধিকারীকে ব্যক্তিগত ইচ্ছায় বঞ্চিত করা যায় না।
বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রী সাধারণত উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার রাখেন। একইভাবে বাবা-মা জীবিত থাকলে তাদের জন্যও নির্ধারিত অংশ সংরক্ষিত থাকে। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে উত্তরাধিকার বণ্টনের হিসাব ও অংশের পরিমাণে পরিবর্তন আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামী আইনে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রথমে উত্তরাধিকারীদের তালিকা নির্ধারণ করা হয়, এরপর শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ গণনা করা হয়। ফলে সম্পত্তি বণ্টন কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ বা পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং এটি একটি নির্ধারিত আইনি ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া।
সচেতনতার ওপর গুরুত্ব
আইনবিদ ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক পরিবারে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং অধিকার বঞ্চনার ঘটনা ঘটে। তাই ফরায়েজ আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্পত্তি বণ্টনের আগে সঠিক হিসাব ও পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের ভাষ্য, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের মূল নীতি হলো—প্রত্যেক বৈধ উত্তরাধিকারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে পারিবারিক স্থিতি বজায় রাখা।
