ভূমি আইন ২০২৬

দেশের বিচার ব্যবস্থা: যখন জমির মামলা গিলে খায় জীবন ও সম্পদ

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটি প্রচলিত কথা আছে— “জমি যার, কাগজপত্র যার, মামলা তার।” তবে এর চেয়েও রূঢ় বাস্তবতা হলো, জমি সংক্রান্ত মামলা একবার শুরু হলে তা শেষ হতে কত বছর লাগবে, তার সঠিক উত্তর কোনো আইনি বইতেও নেই। ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, এটি ৫ বা ১০ বছর নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ বছর কিংবা বংশপরম্পরায় চলতে থাকে।

১. সময়সীমার গোলকধাঁধা: ৫, ১০ নাকি ৩০ বছর?

আইনত একটি দেওয়ানি মামলা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ পর্যন্ত যেতে যেতে একটি মামলার আয়ুষ্কাল অনায়াসেই ১৫ থেকে ২৫ বছর পার করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে ব্যক্তি মামলা শুরু করেছিলেন, তিনি রায় দেখে যেতে পারেননি; তার নাতি-পুতিরা সেই মামলার খরচ টানছে।

২. কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা? ‘টাকা খাওয়ার ধান্দা’ ও প্রশাসনিক জটিলতা

ভূমি অফিস এবং আদালতের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে মামলার নথি গায়েব হওয়া, সমন জারিতে বিলম্ব এবং বারবার সময়ের আবেদন (Adjournment) মামলাকে প্রলম্বিত করে।

  • ভূমি অফিসের ভূমিকা: এসএ, আরএস বা বিএস পর্চায় ভুল এবং জালিয়াতির মাধ্যমেই মূলত বিবাদের সূত্রপাত হয়। ভূমি অফিসের এক শ্রেণির কর্মচারী অর্থের বিনিময়ে জাল দলিল বা ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে দেয়, যা একটি পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

  • আইনি মারপ্যাঁচ: সাক্ষী না আসা, বিচারক সংকট এবং প্রতিপক্ষের বারবার স্থগিতাদেশ চাওয়ার প্রবণতা মামলাকে ‘সারাজীবন’ এর দিকে নিয়ে যায়।

৩. ‘সর্বস্বান্ত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তি নেই’

জমি সংক্রান্ত মামলাকে অনেকেই ‘আর্থিক ক্যান্সার’ হিসেবে অভিহিত করেন। মামলার ফি, আইনজীবীর পেছনে খরচ, যাতায়াত এবং তদবির করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যায়। আপনি ঠিকই বলেছেন— জীবন, যৌবন এবং সঞ্চিত অর্থ সব শেষ হওয়ার পরেই হয়তো কোনো একটি রায় আসে। কিন্তু সেই রায় কার্যকর (Execution) করতে গিয়ে আবার নতুন করে হয়রানির শিকার হতে হয়।

৪. সমাধানের পথ কি বন্ধ?

বিদেশের বিচার ব্যবস্থায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেখানে কয়েকমাস লাগে, সেখানে বাংলাদেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া এবং দেওয়ানি কার্যবিধির আমূল সংস্কার ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

সতর্কবার্তা: ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে যাওয়ার আগে ‘এডিআর’ (ADR) বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, আদালতের লড়াইয়ে জয়ী হলেও শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, মামলার পেছনে হারানো সময় ও অর্থের তুলনায় জমির মূল্য অনেক কম।


পরিশেষে: বাংলাদেশের ভূমি অফিস ও বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না আসলে জমি সংক্রান্ত মামলা মানেই সাধারণ মানুষের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ফাঁদ, যা কেবল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *