নিজের কষ্টার্জিত সম্পত্তি প্রিয়জনদের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টন করে দেওয়ার জন্য অনেকেই মৃত্যুর আগে ‘অছিয়তনামা’ বা ‘উইল’ (Will) করে যান। তবে শুধুমাত্র একটি দলিল লিখে গেলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। দাতা বা উইলকারীর মৃত্যুর পর সেই ইচ্ছাপত্রটি আইনগতভাবে কার্যকর করতে প্রয়োজন হয় আদালতের স্বীকৃতি, যা আইনি পরিভাষায় ‘প্রোবেট’ (Probate) নামে পরিচিত।
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, দলিল থাকা সত্ত্বেও কেন আবার আদালতে যেতে হবে? মূলত অছিয়তনামার সত্যতা এবং এর আইনি বৈধতা নিশ্চিত করার একমাত্র মাধ্যম হলো প্রোবেট।
প্রোবেট আসলে কী?
সহজ কথায়, প্রোবেট হলো কোনো মৃত ব্যক্তির অছিয়তনামার ওপর আদালতের দেওয়া একটি প্রশংসাপত্র বা আইনি সিলমোহর। এর মাধ্যমে আদালত ঘোষণা করে যে, সংশ্লিষ্ট অছিয়তনামাটি আইনত বৈধ এবং এটিই মৃত ব্যক্তির শেষ ইচ্ছা। প্রোবেট ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অছিয়তনামা বাস্তবে কার্যকর করা বা সম্পত্তির নামজারি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন প্রোবেট করা প্রয়োজন?
১. দলিলের সত্যতা যাচাই: অছিয়তনামাটি আসল কি না এবং দাতা এটি স্বেচ্ছায় ও সুস্থ মস্তিষ্কে করেছেন কি না, আদালত তা যাচাই করে। ২. উত্তরাধিকারীদের বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা বা বিরোধ তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ করে দেয় প্রোবেট। ৩. সম্পত্তি হস্তান্তর ও নামজারি: জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট নিজের নামে নামজারি (Mutation) করতে বা বিক্রি করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদালতের প্রোবেট দেখতে চায়। ৪. আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা: ব্যাংক ব্যালেন্স, শেয়ার বা অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর আইনগত দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি অকাট্য প্রমাণ।
কোথায় এবং কীভাবে আবেদন করতে হয়?
অছিয়তনামাটি কার্যকর করার জন্য মৃত ব্যক্তির শেষ আবাস্থল বা তার সম্পত্তি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার জেলা জজ আদালতে আবেদন করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতেও এর আবেদন করা যায়।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
একটি সফল প্রোবেট পিটিশনের জন্য সাধারণত নিচের নথিপত্রগুলো প্রয়োজন হয়:
মূল অছিয়তনামা (Original Will): যা দাতা নিজে স্বাক্ষর করে গেছেন।
মৃত্যুসনদ (Death Certificate): দাতার মৃত্যুর দালিলিক প্রমাণ।
সম্পত্তির বিবরণ: যে সব সম্পত্তির উইল করা হয়েছে, তার সঠিক খতিয়ান ও বিবরণ।
উত্তরাধিকারীদের তথ্য: মৃত ব্যক্তির আইনগত ওয়ারিশদের নাম ও পরিচয়।
প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি: আদালতের নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়।
মুসলিম আইনের বিশেষ দিক
মুসলিম আইনের ক্ষেত্রে অছিয়তনামা করার বিষয়ে একটি বিশেষ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অংশ অছিয়ত করতে পারেন। এর বেশি করতে হলে দাতার মৃত্যুর পর তার অন্যান্য আইনগত উত্তরাধিকারীদের সম্মতির প্রয়োজন হয়। তবে উত্তরাধিকারীদের সম্মতি থাকলে সম্পূর্ণ সম্পত্তিও উইল করা সম্ভব।
উপসংহার
অছিয়তনামা এবং আদালতের অনুমোদন—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ ‘প্রোবেট’। আপনার উত্তরসূরিদের ঝামেলামুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং সম্পত্তির সঠিক বিলিবণ্টন নিশ্চিত করতে অছিয়তনামার পাশাপাশি প্রোবেট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনি জটিলতা এড়াতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।
