“চেয়ারম্যান পদটি কি কেবলই ক্ষমতার দাপট, নাকি জনসেবার এক বিশাল ক্ষেত্র?”—তৃণমূল রাজনীতিতে এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) আওতাধীন বিশাল বরাদ্দ এবং সেবার তালিকা জনসম্মুখে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, একজন চেয়ারম্যান কেন বারবার নির্বাচিত হতে চান, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই দীর্ঘ তালিকায়। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই সেবাগুলোর বড় একটি অংশ সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে দেশের সাধারণ জনগণ।
তালিকা আছে, প্রচার নেই
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশেষ সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ৮০টিরও বেশি সেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা থেকে শুরু করে ভিজিডি (VGD), ভিজিএফ (VGF) এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সরাসরি ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।
উন্নয়ন প্রকল্প: কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা), ১০০ দিনের কর্মসূচি এবং টিআর-এর মতো বিশাল বাজেটের প্রকল্পগুলো গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মেরুদণ্ড।
অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য: রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ-কালভার্ট সংস্কার, গভীর নলকূপ স্থাপন এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার মতো নাগরিক সুবিধাগুলো চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
অন্যান্য সেবা: জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ডিজিটাল সেন্টার পরিচালনা এবং মাদক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মতো সামাজিক দায়িত্বগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত।
অধিকার বনাম দয়া: স্বচ্ছতার সংকট
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই সেবাগুলো অনেক ক্ষেত্রে “ব্যক্তিগত দান” হিসেবে প্রচার করা হয়। প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগও নতুন নয়। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের গেটের সামনে যদি নাগরিক সেবার এই দীর্ঘ তালিকা এবং উপকারভোগীদের নামসহ একটি বড় ব্যানার টাঙিয়ে রাখা হতো, তবে জনগণের ভোগান্তি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসত।
কেন তথ্য প্রকাশ জরুরি?
১. স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: সেবাগুলো জনগণের অধিকার, কারো ব্যক্তিগত বদান্যতা নয়। তালিকা প্রকাশ থাকলে জনগণ জানতে পারবে তারা কী কী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২. দুর্নীতি রোধ: যখন বরাদ্দ এবং ব্যয়ের হিসাব জনগণের হাতের নাগালে থাকবে, তখন অর্থ অপচয় বা নয়ছয় করার সুযোগ কমে যাবে। ৩. জবাবদিহিতা: চেয়ারম্যান পদটি মূলত সেবার জন্য। তথ্যের বিশ্লেষণ থাকলে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা যাবে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে সকল ভাতার তালিকা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট অনলাইনে উন্মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। প্রকৃত দরিদ্র এবং দুস্থ মানুষের হাতে তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হলে প্রতিটি ইউনিয়নে “তথ্য অধিকার” নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার: সময় এসেছে ইউনিয়ন পরিষদকে প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে গ্রামীণ উন্নয়নের প্রকৃত সুফল অধরাই থেকে যাবে। চেয়ারম্যান হবেন সেবক, শাসক নয়—এই বার্তাটিই এখন তৃণমূলের প্রতিটি মানুষের মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
