বাংলাদেশে ভূমির প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করা এবং জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘নামজারি’ বা ‘খারিজ’ (Mutation) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তবে জমির মালিকানা অর্জনের মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে নামজারির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। মূলত ক্রয় সূত্রে, ওয়ারিশ (উত্তরাধিকার) সূত্রে কিংবা উভয় সূত্রে জমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আবেদনের প্রক্রিয়া ও নথিপত্রে এই পার্থক্য হয়। ভূমি সেবা গ্রহীতাদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ক্রয় সূত্রে নামজারির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কেউ যদি দলিলমূলে জমি ক্রয় করে থাকেন, তবে তার নামে নামজারি করতে নিম্নলিখিত কাগজপত্রগুলোর প্রয়োজন হবে:
মূল দলিলের কপি: রেজিস্টার্ড সাফ কবলা বা বিক্রয় দলিলের স্পষ্ট কপি।
রেজিস্ট্রেশন তথ্য: দলিলের ই-চালান বা রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য (যদি থাকে)।
খতিয়ান: বিক্রেতার নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ান (BS/RS/SA/CS)।
জমির পরিচিতি: জমির সুনির্দিষ্ট দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও মৌজার তথ্য।
খাজনা রসিদ: হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের দাখিলা বা রসিদ।
ব্যক্তিগত তথ্য: ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর কপি, সচল মোবাইল নম্বর এবং ই-মেইল ঠিকানা (অনলাইন আবেদনের জন্য)।
ছবি ও দখল: আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জমির দখল সংক্রান্ত প্রমাণপত্র।
২. ওয়ারিশ (উত্তরাধিকার) সূত্রে নামজারির নিয়ম ও কাগজপত্র
পূর্বপুরুষ বা পিতামাতার মৃত্যুর পর তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির মালিকানা নিজেদের নামে করতে ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হলো:
মৃত্যু সনদ: মূল মৃত মালিকের (যার নামে সম্পত্তি রয়েছে) অফিশিয়াল মৃত্যু সনদ।
ওয়ারিশান সনদ: স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ (ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর) কর্তৃক প্রদত্ত উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ সনদপত্র।
খতিয়ান ও দলিল: মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ান/পর্চা এবং জমির মূল দলিলপত্র (যদি থাকে)।
খাজনা রসিদ: হালনাগাদ খাজনা পরিশোধের রসিদ (ডিসিআর/দাখিলা)।
ওয়ারিশদের তথ্য: সকল ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি ও মোবাইল নম্বর।
বণ্টননামা: সকল ওয়ারিশের মধ্যে জমি ভাগ হয়ে থাকলে রেজিস্ট্রিকৃত ‘পারিবারিক বণ্টননামা’ বা ‘আপসনামা’ দলিল (ফরায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হলে)।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: কোনো ওয়ারিশ বিদেশে অবস্থান করলে তার পক্ষে প্রবাসে সম্পাদিত ও সত্যায়িত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা অনুমতিপত্র।
বিশেষ দ্রষ্টব্য (ওয়ারিশদের জন্য):
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না হয়ে থাকলে, সকল ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে নামজারি (যৌথ খতিয়ান) করা হয়।
একজন ওয়ারিশ চাইলে একাই আবেদন করতে পারেন, তবে আবেদনে অন্যান্য সকল ওয়ারিশের তথ্য ও নাম উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।
ওয়ারিশদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকলে নামজারি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে এবং ভূমি অফিস অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে।
৩. ক্রয় ও ওয়ারিশ—উভয় সূত্রে একসঙ্গে নামজারি
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো জমি প্রথমে ওয়ারিশ সূত্রে হস্তান্তরিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে সেই ওয়ারিশদের কাছ থেকে কোনো তৃতীয় পক্ষ জমিটি ক্রয় করেছেন। এই যৌথ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নামজারি করতে উভয় সূত্রের কাগজপত্রের সমন্বয় প্রয়োজন হয়: ১. মূল মৃত মালিকের মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদ। ২. ওয়ারিশদের নামে আলাদা খতিয়ান হয়ে থাকলে তার কপি। ৩. ওয়ারিশদের কাছ থেকে ক্রেতার নামে সম্পাদিত রেজিস্টার্ড বিক্রয় দলিল। ৪. জমির সর্বশেষ খতিয়ান, দাগ ও মৌজার তথ্য। ৫. হালনাগাদ খাজনার রসিদ এবং সর্বশেষ ক্রেতার NID ও মোবাইল নম্বর।
আবেদন করার আগে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, নামজারি আবেদন সাবমিট করার আগে কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত:
তথ্যাদি যাচাই: জমি ক্রয়ের মূল দলিল, খতিয়ান এবং খাজনার রসিদে নাম, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ হুবহু মিল আছে কি না তা আগে যাচাই করে নিন। বানানে ভুল বা দাগ নম্বরে অমিল থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
ওয়ারিশ বাদ না দেওয়া: ওয়ারিশ সূত্রে আবেদনের ক্ষেত্রে কোনো ওয়ারিশের নাম যেন বাদ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যথায় প্রক্রিয়াটি আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।
ডিজিটাল প্রস্তুতি: বর্তমানে নামজারি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। তাই আবেদন করার আগেই সব মূল কাগজপত্র স্পষ্টভাবে স্ক্যান করে PDF ফরম্যাটে প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে অনলাইনে সহজে আপলোড করা যায়।
