জমির প্রকৃত ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, কোনো জমির ব্যবহারের ধরণ বা প্রকৃতি পরিবর্তিত হলে জমির মালিককে নিজ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসকে অবহিত করতে হবে। অন্যথায় আইনি জটিলতা ও বকেয়া করের দায়ভার মালিককেই বহন করতে হবে।
ব্যবহারের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জমির কর নির্ধারিত হবে তার বর্তমান ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে, শুধুমাত্র দলিলে থাকা শ্রেণির ওপর নয়। উদাহরণস্বরূপ:
কৃষি জমি থেকে অকৃষি: যদি কোনো কৃষি জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয় বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয়, তবে তা অকৃষি জমি হিসেবে গণ্য হবে এবং সেই অনুযায়ী উচ্চহারে কর প্রযোজ্য হবে।
পতিত জমি: কোনো মেট্রোপলিটন বা পৌর এলাকায় আবাসিক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত জমি যদি বর্তমানে চাষাবাদ বা পতিত অবস্থায় থাকে, তবে শর্তসাপেক্ষে তাকে কৃষি জমি হিসেবে বিবেচনা করে কর নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ভূমির মালিককে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন করতে হবে।
শ্রেণি পরিবর্তন বনাম ব্যবহারের পরিবর্তন
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে যা সাধারণ জমির মালিকদের জানা জরুরি। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জমির ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন হলে করের হার পুনঃনির্ধারণ করা হবে, কিন্তু এর মাধ্যমে জমির স্থায়ী ‘শ্রেণি’ (যেমন: রেকর্ডভুক্ত নাল, ভিটি বা ডোবা) পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অর্থাৎ, আপনি কৃষি জমিতে বাড়ি করলে আপনাকে আবাসিক হারের কর দিতে হবে, কিন্তু সরকারি রেকর্ডে জমিটি কৃষি থেকে সরাসরি ‘বাস্তু’ বা ‘আবাসিক’ শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে না—তার জন্য পৃথক নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও প্রতিকার
১. স্বপ্রণোদিত ঘোষণা: জমির মালিকের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব হলো ব্যবহারের প্রকৃতি পরিবর্তনের সাথে সাথে এসি ল্যান্ড অফিসকে জানানো। ২. জরিপ ও আপিল: যদি কোনো মালিক মনে করেন তার জমির কর ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে তিনি নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সরকারি সার্ভেয়ার দ্বারা জমি জরিপ করিয়ে প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতে কর পুনঃনির্ধারণ করাতে পারবেন। ৩. নিষ্পত্তির সময়সীমা: এ সংক্রান্ত যেকোনো আবেদন প্রাপ্তির ৪৫ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষকে তা নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৪. আপিলের সুযোগ: এসি ল্যান্ডের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), বিভাগীয় কমিশনার বা ভূমি আপিল বোর্ডে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল করার অধিকার মালিকের থাকবে।
করের বর্তমান হার (সংক্ষিপ্ত)
প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়াণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় শিল্প বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত অকৃষি জমির করের হার প্রতি শতাংশে ১২৫ টাকা। অন্যদিকে, একই এলাকায় আবাসিক ব্যবহারের জন্য এই হার প্রতি শতাংশে ২২ টাকা। জেলা সদর বা গ্রামীণ এলাকার ক্ষেত্রে এই হার আরও অনেক কম।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতে সঠিক রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা এবং সাধারণ জনগণের জন্য কর প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ন্যায়সঙ্গত করা। সচেতন নাগরিক হিসেবে জমির সঠিক ব্যবহার ঘোষণা করে অনাকাঙ্ক্ষিত জরিমানা এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

