দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমাগত বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে এবং ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক সংকটে পড়া সত্ত্বেও যেসব ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও আন্তরিকতা রয়েছে, তাদের জন্য ঋণের মূল টাকা এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে দায় নিষ্পত্তির বা ‘বিশেষ এক্সিট’ সুবিধা দিয়ে নতুন নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
গত ২৯ জুন ২০২৬ (১৫ আষাঢ় ১৪৩৩) তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ (বিআরপিডি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার লেটার (নং-২৩) দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কেন এই বিশেষ সুবিধা? সার্কুলারে বলা হয়েছে, দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, যেসব ঋণগ্রহীতা বাস্তবসম্মত আর্থিক সংকটের কারণে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, কিন্তু ব্যবসা সচল রাখার সক্ষমতা ও সদিচ্ছা রয়েছে, তাদের এককালীন বিশেষ এক্সিট সুবিধা দিলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যেমন কমবে, তেমনই নতুন ঋণ প্রবাহের গতি ফিরবে।
নীতিমালার প্রধান নির্দেশনাবলী ও শর্তসমূহ:
১. এককালীন পরিশোধ: এই বিশেষ এক্সিট সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংকের সমুদয় পাওনা বা নির্ধারিত দায় এককালীন পরিশোধ করতে হবে।
২. সুদ মওকুফে বড় শিথিলতা: এই সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতাদের সকল আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে আগের কিছু কঠোর শর্ত শিথিল করা হয়েছে। বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৬/২০২২ এর তহবিলের ব্যয় (Cost of Fund) আদায় নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত শর্ত এবং বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং-১৮/২০২২ এর রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের আয় খাত বিকলন করে সুদ মওকুফ না করার শর্তটি এই নীতিমালার ক্ষেত্রে শিথিল থাকবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সুবিধার্থে আরও নমনীয়ভাবে সুদ মওকুফ করতে পারবে।
৩. আওতাভুক্ত ঋণ: ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক তারিখে যেসব ঋণ ‘মন্দ ও ক্ষতিকারক’ (Bad/Loss) মানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়েছে, কেবল সেই ঋণগুলোই পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে এবং ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এই এক্সিট সুবিধা পাবে। এছাড়া, গত ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে যেসব ঋণ পুনঃতফসিল (Reschedule) করা হয়েছিল, সেগুলোও এই নীতিমালার আওতায় বিশেষ এক্সিট সুবিধা পাবে।
৪. কোন কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে: দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে এই নীতিমালার আওতায় কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণ এবং সিএমএসএমই (CMSME) খাতের কটেজ, মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম ঋণসমূহকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫. ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব ও সময়সীমা: এই সার্কুলারে বর্ণিত বিশেষ এক্সিট সুবিধার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে পত্র প্রেরণ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাদের অবহিত করতে হবে। এই নীতিমালার নির্দেশনা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (বিআরপিডি-১) গাজী মোঃ মাহফুজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনাটি ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ৪৫ এবং ৪৯(১)(চ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন আটকা পড়া বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ দ্রুত ব্যাংকিং সিস্টেমে ফেরত আসবে, অন্যদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন করে ব্যবসা পরিচালনায় মনোযোগী হতে পারবেন।
