আজকের খবর ২০২৬

অন্যের জমি ১২ বছর দখলে রাখলেই কি মালিকানা? নতুন ভূমি আইনে বদলে গেল সমীকরণ!

আমাদের সমাজে জমিজমা নিয়ে একটি দীর্ঘদিনের ও বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে— “কারো জমি টানা ১২ বছর দখলে রাখতে পারলে, সেই জমির মালিকানা পাওয়া যায়।” দেশের প্রচলিত দেওয়ানি আইনে একে বলা হয় ‘Adverse Possession’ বা ‘বিরুদ্ধ দখল’। কিন্তু ২০২৩ সালে নতুন ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ পাস হওয়ার পর এই নিয়মের ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। জোরপূর্বক বা জবরদখল করে অন্যের জমি নিজের করে নেওয়ার দিন এখন কার্যত শেষ।

তাহলে বর্তমান আইনি অবস্থানটি আসলে কী? তামাদি আইন, ১৯০৮ এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:

১. তামাদি আইনের ২৮ ধারা ও বিরুদ্ধ দখল (Adverse Possession)

উপমহাদেশের পুরনো দেওয়ানি আইন তথা ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ২৮ ধারা এবং এর ১৪২ ও ১৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কারও সম্পত্তিতে প্রকাশ্য, নিরবচ্ছিন্ন এবং মূল মালিকের স্বার্থের বিরুদ্ধে (Hostile intent) টানা ১২ বছর দখল বজায় রাখেন, এবং মূল মালিক যদি এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আদালত বা অন্য কোথাও দখল উদ্ধারের কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেন, তবে মূল মালিকের উক্ত জমির উপর অধিকার বিলুপ্ত হতো। ফলস্বরূপ, দখলদার ব্যক্তি ওই জমির স্বত্ব বা মালিকানা দাবি করতে পারতেন। মূলত মূল মালিকের উদাসীনতাকে শাস্তি দিতে এবং জমির দীর্ঘমেয়াদি দখলদারকে সুরক্ষা দিতে এই আইন ব্যবহৃত হতো।

২. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৭ ধারা: এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

২০২৩ সালে পাস হওয়া নতুন ভূমি আইনে অবৈধ দখলকে একটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি পেশিশক্তি, জবরদখল বা কোনো প্রকার অবৈধ পন্থায় অন্যের জমি দখল করেন কিংবা দখলে রাখেন, তবে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য অপরাধীর সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বর্তমান আইনি অবস্থান: তবে কি তামাদি আইনের ২৮ ধারা বাতিল?

নতুন আইন আসার পর সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তবে কি তামাদি আইনের বিরুদ্ধ দখলের নিয়মটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে?

আইনি বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর হলো— না, তামাদি আইনের ২৮ ধারা সরাসরি বাতিল হয়নি। তবে নতুন আইনের ফলে জবরদখলকারীদের জন্য এটি আর আগের মতো ঢাল বা অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে না। বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে যেভাবে দেখতে হবে:

  • জোরপূর্বক দখল এখন ফৌজদারি অপরাধ: কেউ যদি এখন জোরপূর্বক, জবরদস্তি বা জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি দখল করে ১২ বছর পার করার পরিকল্পনা করেন, তবে তিনি পার পাবেন না। মূল মালিক যেকোনো সময় ২০২৩ সালের নতুন আইনের অধীনে সরাসরি ক্রিমিনাল অ্যাকশন নিতে পারবেন অথবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দ্রুততম সময়ে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন করতে পারবেন।

  • দেওয়ানি বনাম ফৌজদারি সংঘাত: তামাদি আইনের ২৮ ধারা একটি দেওয়ানি অধিকার (Civil Right) নিয়ে কথা বলে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের আইনটি অবৈধ দখলকে ফৌজদারি অপরাধ (Criminal Offence) বানিয়েছে। আইনের একটি সর্বজনীন নীতি হলো— কোনো অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমে দেওয়ানি অধিকার বা বৈধ সুবিধা অর্জন করা যায় না (No one can benefit from his own wrong)। ফলে অপরাধ করে মালিকানা দাবির সুযোগ বন্ধ হয়েছে।

  • অতীতের দখল ও আইনগত অবস্থান: তবে মনে রাখতে হবে, ২০২৩ সালের আইনটি ভূতাপেক্ষ (Retrospective) নয়। অর্থাৎ, এই আইন পাসের বহু আগেই (২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পূর্বে) যদি কেউ তামাদি আইনের ২৮ ধারা অনুযায়ী টানা ১২ বছরের নিরবচ্ছিন্ন বিরুদ্ধ দখলের শর্ত পূরণ করে থাকেন এবং বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক সেই জমির বৈধ মালিকানার ডিক্রি বা রায় পেয়ে যান, তবে সেই অতীতের প্রতিষ্ঠিত অধিকারের ক্ষেত্রে এই নতুন ফৌজদারি ধারা প্রযোজ্য হবে না।

শেষ কথা

সংক্ষেপে বলতে গেলে, জাল-জালিয়াতি বা গায়ের জোরে অন্যের জমি দখল করে ১২ বছর পার করে মালিক বনে যাওয়ার সুযোগ এখন চিরতরে বন্ধ। নতুন ভূমি আইন অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ উন্মুক্ত করেছে, যা দেশের সাধারণ ও প্রবাসী ভূমি মালিকদের জন্য এক বিশাল আইনি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *