ব্যাংকিং কার্যক্রম

বাংলাদেশে টাকা রাখার জন্য কোন ব্যাংক তুলনামূলক নিরাপদ? ৬ ব্যাংক নিয়ে আমানতকারীদের আগ্রহ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য এবং সুশাসন নিয়ে নানা উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আমানতকারীদের কাছে একটি প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—টাকা কোন ব্যাংকে রাখলে তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেশি সুদ বা আকর্ষণীয় ডিপোজিট রেট দেখে ব্যাংক নির্বাচন করা ঠিক নয়। একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঋণের গুণগত মান, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য, করপোরেট গভর্ন্যান্স, আর্থিক প্রতিবেদন এবং ক্রেডিট রেটিং—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চিত্রও আমানতকারীদের সতর্ক হওয়ার কারণ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ সালের মুদ্রানীতি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার Capital to Risk-Weighted Assets Ratio (CRAR) ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ।

অর্থাৎ, সব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এক নয়। দুর্বল ব্যাংকের পাশাপাশি তুলনামূলক শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও ভালো ব্যবস্থাপনার ব্যাংকও রয়েছে। এ কারণে আমানত রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকভেদে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রেডিট রেটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বোঝার অন্যতম সূচক হলো Credit Rating। দীর্ঘমেয়াদি দায় পরিশোধের সক্ষমতা এবং স্বল্পমেয়াদি আর্থিক দায় মেটানোর সক্ষমতা মূল্যায়নে ক্রেডিট রেটিং ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং বাজারে AAA এবং ST-1-এর মতো রেটিংকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্থানীয় রেটিংগুলোর মধ্যে ধরা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আমানত শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত।

উদাহরণ হিসেবে, ব্র্যাক ব্যাংক জানিয়েছে যে তাদের স্থানীয় রেটিং CRAB-এর মাধ্যমে AAA/ST-1 পর্যায়ে রয়েছে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও তাদের রেটিং রয়েছে।

অন্যদিকে, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও দীর্ঘমেয়াদে AAA এবং স্বল্পমেয়াদে ST-1 রেটিংয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রেটিং স্থায়ী কোনো সনদ নয়। ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ, মূলধন, পরিচালনা কাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তিত হলে রেটিংও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো কোনো রেটিং দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সর্বশেষ রেটিং যাচাই করা জরুরি।

আলোচনায় থাকা ৬ বেসরকারি ব্যাংক

ক্রেডিট রেটিং, দীর্ঘদিনের কার্যক্রম, বাজারে অবস্থান এবং আর্থিক সক্ষমতার বিভিন্ন সূচক নিয়ে আমানতকারীদের আলোচনায় থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. ব্র্যাক ব্যাংক
২. ইস্টার্ন ব্যাংক
৩. সিটি ব্যাংক
৪. ডাচ্-বাংলা ব্যাংক
৫. প্রাইম ব্যাংক
৬. পুবালী ব্যাংক

তবে এই তালিকাকে কোনো সরকারি ‘সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক’ র‌্যাংকিং হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এসব ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন, ক্রেডিট রেটিং, খেলাপি ঋণ, মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতি দেখে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।

শুধু বেশি মুনাফা দেখলেই হবে না

অনেক সময় কোনো ব্যাংক আমানত আকর্ষণ করতে তুলনামূলক বেশি সুদ বা মুনাফার হার ঘোষণা করে। কিন্তু বেশি মুনাফা মানেই বেশি নিরাপত্তা নয়। বরং কোনো ব্যাংক কেন অন্যদের তুলনায় বেশি হারে আমানত সংগ্রহ করছে, সেটিও আমানতকারীর বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

ব্যাংকের Cost of Fund, Loan-to-Deposit Ratio, NPL, Provision Coverage, CRAR, Liquidity Coverage Ratio (LCR) এবং লাভের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭.০২ লাখ কোটি টাকা এবং অতিরিক্ত তরল সম্পদ ছিল প্রায় ৩.৭৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো খাতের তারল্য পরিস্থিতি এককভাবে বিচার না করে ব্যাংকভিত্তিক অবস্থাও দেখা প্রয়োজন।

খেলাপি ঋণ এখন বড় ঝুঁকি

বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার ঋণের গুণগত মানকে। কারণ খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের আয় কমে যেতে পারে, বেশি প্রভিশন রাখতে হয় এবং মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট NPL অনুপাত ৩৫.৭৩ শতাংশে উঠে গেলেও ২০২৬ সালের মার্চে তা ৩২.২৬ শতাংশে নেমেছে। তারপরও এটি অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার ঋণঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্বব্যাংকও ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এবং related-party lending-কে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদনের কথা জানিয়েছে।

আমানতকারীর কী কী দেখা উচিত?

ব্যাংকে টাকা রাখার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা যেতে পারে—

প্রথমত, সর্বশেষ Credit Rating। শুধু AAA বা ST-1 লেখা দেখলেই হবে না; রেটিংয়ের তারিখ এবং মেয়াদও দেখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ Audited Financial Statements। ব্যাংকের সম্পদ, দায়, মূলধন, মুনাফা, খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনের অবস্থান বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, NPL ও Provision Coverage। খেলাপি ঋণ বেশি হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সেই ঋণের বিপরীতে ব্যাংক পর্যাপ্ত প্রভিশন রেখেছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, Capital Adequacy। পর্যাপ্ত মূলধন থাকলে ঋণগ্রহীতার ঋণখেলাপি হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকে।

পঞ্চমত, তারল্য। গ্রাহক যখন টাকা তুলতে চান, তখন ব্যাংকের পর্যাপ্ত তরল সম্পদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ষষ্ঠত, Corporate Governance। পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, related-party transactions এবং ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এক ব্যাংকে সব টাকা না রাখাই ভালো

বড় অঙ্কের আমানতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ কৌশল হলো অর্থ এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না করা। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক শক্তিশালী ব্যাংকে আমানত ভাগ করে রাখা যেতে পারে। এতে কোনো একটি ব্যাংকের কার্যক্রম বা আর্থিক পরিস্থিতিতে সমস্যা দেখা দিলে পুরো অর্থ একই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে না।

তবে ব্যাংক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিজের প্রয়োজনও বিবেচনা করা জরুরি। কারও কাছে শাখা ও ATM নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ, কারও কাছে অনলাইন ব্যাংকিং ও অ্যাপ, আবার কারও কাছে বেশি মুনাফা বা নির্দিষ্ট মেয়াদের DPS/FDR গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শেষ কথা

বর্তমান বাস্তবতায় ‘কোন ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি সুদ?’—এর চেয়ে ‘কোন ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলক শক্তিশালী?’—এই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও পুবালী ব্যাংককে নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে তুলনামূলক নিরাপত্তার আলোচনা থাকলেও কোনো ব্যাংককেই শুধু নামের ভিত্তিতে শতভাগ নিরাপদ ঘোষণা করা যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক রেজল্যুশন, আমানত সুরক্ষা এবং তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে।

তাই আমানত রাখার আগে সর্বশেষ ক্রেডিট রেটিং + আর্থিক প্রতিবেদন + NPL + মূলধন + তারল্য + সুশাসন—এই ছয়টি বিষয় যাচাই করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। আর বড় অঙ্কের অর্থ হলে একক ব্যাংকের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে ঝুঁকি ভাগ করে রাখাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

নোট: এই প্রতিবেদন কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকে টাকা রাখার ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শ নয়। ব্যাংকের আর্থিক তথ্য ও ক্রেডিট রেটিং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে; সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য যাচাই করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *