আজকের খবর ২০২৬

অবসরেও রেশন: পুলিশ, সেনা-নৌ-বিমান ও বিজিবির সদস্যরা কী সুবিধা পান?

দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিজিবির সদস্যদের দায়িত্ব আলাদা হলেও তাঁদের অবসর-পরবর্তী কল্যাণ সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে অবসর নেওয়ার পরও রেশন সুবিধা পাওয়া যায় কি না—এ প্রশ্নটি এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

সম্প্রতি পাওয়া একটি সরকারি চিঠিতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ পুলিশের নির্দিষ্ট শ্রেণির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পরিবারের জন্য ভর্তুকি মূল্যে আজীবন রেশন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি সব পুরোনো অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়; ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পর অবসর নেওয়া সদস্যদের জন্য এ সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা কী রেশন পান?

ছবিতে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের চিঠিতে বাংলাদেশ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পরিবারের সর্বোচ্চ দুই সদস্যের জন্য রেশন সুবিধার কথা উল্লেখ রয়েছে।

সেখানে দুই সদস্যের পরিবারের জন্য মাসিক রেশন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল—

  • ২০ কেজি চাল/আটা ধরনের খাদ্যশস্য;
  • ২০ কেজি আটা;
  • ৪.৫ কেজি ভোজ্যতেল;
  • ২ কেজি ডাল।

একজন সদস্যের পরিবার হলে নির্ধারিত পরিমাণের অর্ধেক দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সিদ্ধান্তের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতিপত্রেও দুই সদস্যের পরিবারের জন্য ভর্তুকিতে রেশন দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—‘আজীবন রেশন’ মানে পরিবারের সবাই আজীবন রেশন পাবেন—এমন নয়। সিদ্ধান্তে পরিবারের সর্বোচ্চ দুই সদস্যের সীমা এবং সন্তানদের বয়সসহ বিভিন্ন শর্ত রাখা হয়েছিল। অবিবাহিত কন্যা, প্রতিবন্ধী ও বিকলাঙ্গ সন্তান এবং স্ত্রী/নির্দিষ্ট নির্ভরশীল সদস্যদের ক্ষেত্রে আলাদা বিধান রয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২০ সালের আগে অবসরে যাওয়া বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য এই সুবিধার বাইরে থাকার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সংগঠনগুলো এই বৈষম্য দূর করে সব অবসরপ্রাপ্ত সদস্যকে রেশন সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিল।

তাহলে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা কি রেশন পান?

হ্যাঁ—সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন-সংক্রান্ত সুবিধার সরকারি কাঠামো রয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কার্যবণ্টন সংক্রান্ত তথ্যেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের রেশন ভাতার হার নির্ধারণ সংক্রান্ত কাজ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের জন্য রেশন সুবিধা/রেশন ভাতা সরকারি ব্যবস্থার অংশ।

এখানে পুলিশের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের ক্ষেত্রে ২০২০ সালে অবসর-পরবর্তী পারিবারিক রেশন দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যসামগ্রীর হিসাবসহ আলাদা সিদ্ধান্ত হয়েছিল। অন্যদিকে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ক্ষেত্রে সরকারি নথিতে ‘রেশন ভাতা’ নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি স্পষ্ট।

অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের রেশন সুবিধা আছে—তবে সেটিকে পুলিশের ২০২০ সালের দুই সদস্যের পরিবারের ভর্তুকি রেশন ব্যবস্থার সঙ্গে হুবহু একই কাঠামো বলা ঠিক হবে না।

নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রে কী?

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীও সশস্ত্র বাহিনীর অংশ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি কার্যবণ্টনে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রশাসনিক কার্যক্রম, অবসর, পেনশন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধাগুলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সরকারি নথিতে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন ভাতার হার নির্ধারণের দায়িত্বও উল্লেখ আছে।

নৌবাহিনীর নিজস্ব নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি তথ্যেও চাকরির সময় পরিবারকে রেশন সুবিধা, অবসরকালীন ভাতা ও পেনশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অবসর-পরবর্তী পরিবারের চিকিৎসা সুবিধার কথাও নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক তথ্যপত্রে রয়েছে।

তাই নৌ ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের অবসর-পরবর্তী সুবিধা নেই—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং তাঁরা সামরিক অবসর সুবিধা, পেনশন এবং প্রযোজ্য রেশন/রেশন-ভাতা কাঠামোর আওতায় থাকেন। তবে কার কত রেশন বা ভাতা প্রাপ্য, তা পদ, শ্রেণি, চাকরির ধরন ও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে।

বিজিবির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের বিষয়টি কী?

বিজিবির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিজিবি সদস্যদের কল্যাণমূলক পদক্ষেপের কথা বলতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্যদের আজীবন রেশন সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছিলেন।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবির অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশনাতেও সকল অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্যের দুই ইউনিট রেশন সুবিধার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থাৎ বিজিবির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের রেশন সুবিধার দাবিটি শুধু একটি প্রস্তাব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা নয়; এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা রয়েছে এবং বর্তমান বিজিবি-সম্পর্কিত প্রকাশনাতেও দুই ইউনিট রেশনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে বিজিবির ক্ষেত্রে কোন ব্যাচ, কোন শ্রেণির অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, কীভাবে রেশন গ্রহণ করবেন এবং বর্তমান হারে ঠিক কী কী পণ্য বা ভাতা প্রযোজ্য—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ, সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ্যে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সবার জন্য একই শর্তে ঠিক একই পরিমাণ রেশন নিশ্চিত হয়েছে—এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন।

তাহলে চার বাহিনীর তুলনায় চিত্রটি কী?

তথ্য বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো—

বাংলাদেশ পুলিশ: ২০২০ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় থেকে অবসর নেওয়া সদস্যদের পরিবারের সর্বোচ্চ দুই সদস্যের জন্য ভর্তুকি মূল্যে রেশন সুবিধা। তবে ২০২০ সালের আগের অবসরপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ এই সুবিধার বাইরে থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সেনাবাহিনী: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য রেশন ভাতা নির্ধারণের সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে।

নৌবাহিনী: সামরিক অবসর সুবিধা ও পেনশনের পাশাপাশি রেশন-সংক্রান্ত সামরিক সুবিধার কাঠামোর আওতায় রয়েছে; অবসর-পরবর্তী পরিবারের চিকিৎসা সুবিধার কথাও সরকারি নৌবাহিনী তথ্যপত্রে উল্লেখ আছে।

বিমানবাহিনী: সশস্ত্র বাহিনীর একই প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোর আওতায় অবসর ও রেশন-সংক্রান্ত সুবিধা পরিচালিত হয়।

বিজিবি: অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের আজীবন রেশন দেওয়ার ব্যবস্থা করার সরকারি ঘোষণা রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বিজিবি-সংশ্লিষ্ট প্রকাশনাতেও দুই ইউনিট রেশনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা দূর করা দরকার

অনেক সময় বলা হয়, ‘শুধু পুলিশই অবসরের পর আজীবন রেশন পায়।’ তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি এতটা সরল নয়।

সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের জন্যও রেশন ভাতার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতে সরাসরি ‘সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীগণের রেশন ভাতার হার নির্ধারণ’ করার দায়িত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।

আবার পুলিশের ক্ষেত্রে ২০২০ সালের সিদ্ধান্তটি ছিল নির্দিষ্ট শর্তে পারিবারিক রেশন দেওয়ার ব্যবস্থা। ফলে ‘রেশন সুবিধা’ শব্দটি একই হলেও দুই প্রতিষ্ঠানের সুবিধার ধরন, ইউনিট, হিসাব ও যোগ্যতার নিয়ম এক নয়।

আর বিজিবির ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের আজীবন রেশনের ব্যবস্থা করার সরকারি ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নের বর্তমান কাঠামো নিয়ে আরও নির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বলা সম্ভব।

অবসর-পরবর্তী কল্যাণে সমতার প্রশ্ন

দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের অবসর-পরবর্তী জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্নটি নিছক রেশন পাওয়ার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, মর্যাদা ও কল্যাণনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

একজন পুলিশ সদস্য দীর্ঘ কর্মজীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেন। একজন সেনাসদস্য সীমান্ত ও জাতীয় প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। নৌসদস্য সমুদ্রসীমা এবং বিমানসদস্য আকাশসীমা রক্ষায় নিয়োজিত থাকেন। একইভাবে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন।

তাই অবসরের পর তাঁদের জন্য কোন বাহিনীতে কী সুবিধা আছে, কারা পাচ্ছেন, কোন তারিখ থেকে পাচ্ছেন, পরিবারের কতজন পাচ্ছেন এবং সুবিধাটি রেশন হিসেবে দেওয়া হচ্ছে নাকি রেশন ভাতা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয় স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি।

শেষ কথা

সার্বিক তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশ পুলিশের নির্দিষ্ট শ্রেণির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা শর্তসাপেক্ষে আজীবন ভর্তুকি রেশন সুবিধা পান; সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের জন্যও সরকারি রেশন ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে; আর বিজিবির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের আজীবন রেশন সুবিধা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ ও সাম্প্রতিক প্রকাশ্য তথ্য রয়েছে।

তবে চার বাহিনীর সুবিধা একই ধরনের বা একই পরিমাণের নয়। বিশেষ করে পুলিশের ২০২০ সালের সিদ্ধান্তে অবসরের তারিখ ও পরিবারের সদস্যসংখ্যা নিয়ে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। ফলে ‘সব অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আজীবন রেশন পান’—এমন সার্বজনীন বক্তব্য সঠিক হবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে পুরোনো ও নতুন ব্যাচের সুবিধার পার্থক্য যেন না থাকে এবং প্রত্যেক বাহিনীর অবসর-পরবর্তী রেশন সুবিধার বর্তমান নিয়ম, যোগ্যতা ও পরিমাণ সরকারি ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের বিভ্রান্তি যেমন কমবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতাও বাড়বে।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *