করযোগ্য আয় না থাকলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য আইনি বাধ্যবাধকতা-বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা গণকর্মচারীদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক—আয়কর আইন, ২০২৩-এর বিদ্যমান বিধানে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত ‘আয়কর নির্দেশিকা, ২০২৬-২০২৭’-এও বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে—এমন ব্যক্তিদের তালিকায় ‘গণকর্মচারী’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ‘আয়কর নির্দেশিকা, ২০২৬-২০২৭’ প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনের ধারা ১৬৬-তে কী বলা হয়েছে?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬(১) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে—
- করমুক্ত সীমার বেশি আয় থাকা ব্যক্তি;
- আগের তিন বছরের কোনো এক বছরে যার কর নির্ধারণ হয়েছে;
- কোম্পানি, ফার্ম ও অন্যান্য নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি;
- ব্যবসায়ের নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে থাকা নির্দিষ্ট কর্মচারী;
- গণকর্মচারী;
- বাংলাদেশে স্থায়ী স্থাপনা থাকা নির্দিষ্ট অনিবাসী ব্যক্তি;
- আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রদানে বাধ্য ব্যক্তি।
আইনের ভাষায় ‘গণকর্মচারী’ হওয়াটিই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার একটি স্বতন্ত্র ভিত্তি। অর্থাৎ, শুধু আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করেছে কি না—এই একটি বিষয় দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: কর দিতে না হলেও রিটার্ন লাগতে পারে
অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—আয় করযোগ্য না হলে রিটার্ন দাখিলেরও প্রয়োজন নেই। কিন্তু গণকর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।
আয়কর আইনের ধারা ১৬৬-এ করমুক্ত সীমার বেশি আয় থাকা ব্যক্তিদের জন্য এক ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আবার গণকর্মচারী হিসেবে পৃথকভাবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
তাই কোনো সরকারি কর্মচারীর হিসাব অনুযায়ী প্রদেয় আয়কর শূন্য হলেও, আইন অনুযায়ী তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
সহজভাবে বলা যায়:
আয়কর দেওয়া আর আয়কর রিটার্ন দাখিল করা এক বিষয় নয়।
কোনো ব্যক্তির করযোগ্য করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে, কিন্তু আইনগত কারণে তার রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
এনবিআরের আয়কর-সংক্রান্ত তথ্যেও করযোগ্য আয় থাকা ব্যক্তি এবং আইন অনুযায়ী আবশ্যিকভাবে রিটার্ন দাখিলে বাধ্য ব্যক্তি—এই দুই ধরনের করদাতার কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘গণকর্মচারী’ শব্দটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পুরোনো আয়কর ব্যবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রিটার্ন বাধ্যতামূলক হওয়ার ক্ষেত্রে কখনো কখনো বেতনসীমা বা অন্যান্য নির্দিষ্ট শর্ত নিয়ে আলোচনা দেখা যেত। কিন্তু আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-এর বর্তমান কাঠামোয় ‘public servant’ বা ‘গণকর্মচারী’কে স্বতন্ত্রভাবে বাধ্যতামূলক রিটার্নদাতার তালিকায় রাখা হয়েছে।
এ কারণে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুধু বেতন কত—তা দেখে রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরির আইনগত অবস্থান এবং আয়কর আইনে ব্যবহৃত ‘গণকর্মচারী’ সংজ্ঞাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এও একই বার্তা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নতুন করবর্ষের জন্য ‘আয়কর নির্দেশিকা, ২০২৬-২০২৭’ প্রকাশ করেছে। নির্দেশিকার শুরুতেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের তালিকায় গণকর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উঠে এসেছে।
ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—
সরকারি চাকরিতে আছেন বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়করমুক্ত হয়ে যাবেন না; বরং আয়কর আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা পালন করতে হবে।
রিটার্নে কী কী তথ্য দিতে হয়?
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার রিটার্নে সাধারণভাবে তার—
- বিভিন্ন উৎসের আয়;
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদের তথ্য;
- দায় বা ঋণের তথ্য;
- জীবনযাপন-সংক্রান্ত ব্যয়ের তথ্য;
- প্রযোজ্য কর হিসাব;
- উৎসে কর্তিত করের তথ্য
ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। রিটার্নের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত তফসিল, বিবৃতি ও অন্যান্য তথ্যও দিতে হয়।
সম্পদ ও দায়ের বিবরণী নিয়েও সচেতনতা জরুরি
রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব গণকর্মচারীকে একই ধরনের সম্পদ বিবরণী একইভাবে দাখিল করতে হবে। সম্পদ ও দায়ের পৃথক বিবরণী দাখিলের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালায় নির্ধারিত শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।
তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচিত—
১. নিজের আয় ও সম্পদের ধরন যাচাই করা;
২. প্রযোজ্য রিটার্ন ফরম ও তফসিল নির্ধারণ করা;
৩. অনলাইন রিটার্ন দাখিলসংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা;
৪. প্রয়োজন হলে কর আইনজীবী বা আয়কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
এনবিআর ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু ও সম্প্রসারণ করেছে এবং এ বিষয়ে বিশেষ আদেশও প্রকাশ করেছে। তবে কার জন্য কোন পদ্ধতিতে অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক এবং কারা ছাড় পাবেন—তা সংশ্লিষ্ট করবর্ষের সর্বশেষ এনবিআর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
রিটার্ন দাখিল না করলে কী হতে পারে?
আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করলে জরিমানা ও অন্যান্য আর্থিক জটিলতার মুখে পড়তে পারেন। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা, ন্যূনতম ১ হাজার টাকা, এবং ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানার বিধান থাকতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ধারার ভিত্তিতে ব্যবস্থা ভিন্ন হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য কী করা উচিত?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, ব্যক্তিগত টিআইএন আছে কি না তা যাচাই করা।
দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট করবর্ষের জন্য রিটার্ন দাখিলের নিয়ম ও সময়সীমা জেনে নেওয়া।
তৃতীয়ত, বেতন থেকে উৎসে কর কর্তন হয়েছে কি না তার তথ্য সংগ্রহ করা।
চতুর্থত, অন্যান্য আয়—যেমন বাড়িভাড়া, ব্যাংক সুদ, সঞ্চয়পত্রের আয় বা অন্যান্য উৎস—থাকলে তা সঠিকভাবে হিসাব করা।
পঞ্চমত, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সম্পদ, দায় ও ব্যয়ের তথ্য প্রস্তুত রাখা।
ষষ্ঠত, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা।
বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় ‘করযোগ্য আয়’ এবং ‘রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা’কে একই বিষয় মনে করার কারণে।
বাস্তবে—
করযোগ্য আয় থাকলে করের হিসাব আসতে পারে।
কিন্তু
আইনে বাধ্যতামূলক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত থাকলে কর শূন্য হলেও রিটার্ন দাখিলের দায়িত্ব থাকতে পারে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-এ গণকর্মচারীকে বাধ্যতামূলক রিটার্নদাতার শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিষয়টি আবারও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। আইন অনুযায়ী গণকর্মচারীদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে—তাই শুধু ‘আমার আয় করমুক্ত সীমার নিচে’ এই যুক্তিতে রিটার্ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে প্রত্যেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত আয়, সম্পদ, দায়, করবর্ষ এবং প্রযোজ্য আইনগত অবস্থার ভিত্তিতে রিটার্নের ধরন ও সংযুক্তি ভিন্ন হতে পারে। ফলে সময়মতো সর্বশেষ এনবিআর নির্দেশনা অনুসরণ করে সঠিকভাবে রিটার্ন দাখিল করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সংক্ষেপে: সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী—অর্থাৎ গণকর্মচারী হলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬ অনুযায়ী আয়কর রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি বাধ্যতামূলক শ্রেণির মধ্যে পড়ে। কর দিতে হবে কি না, সেটি রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে পৃথক প্রশ্ন।

