মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের মোটরযানের বকেয়া কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স জরিমানা ছাড়াই হালনাগাদ করার সময়সীমা আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। এই সময়ের মধ্যে শুধু মূল কর ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে মোটরযানের ফিটনেস, ট্যাক্স-টোকেন, রুট পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করা যাবে। একই সুবিধার আওতায় ড্রাইভিং লাইসেন্সও নবায়ন বা হালনাগাদের সুযোগ থাকছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিআরটিএর এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিন ধরে কাগজপত্র হালনাগাদ করতে না পারা মোটরযান মালিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জরিমানা ও বিলম্ব ফি জমে যাওয়ার কারণে যারা এতদিন কাগজপত্র নবায়ন করতে পারেননি, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল কর ও ফি পরিশোধ করে নিয়মিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কোন কোন কাগজপত্র হালনাগাদ করা যাবে?
বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো জরিমানা ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের মোটরযানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করা যাবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- মোটরযানের ফিটনেস সনদ
- ট্যাক্স-টোকেন
- রুট পারমিট
- প্রযোজ্য অন্যান্য মোটরযানসংক্রান্ত কাগজপত্র
- ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদ বা নবায়ন
তবে এই সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল কর ও নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, জরিমানা মওকুফ হলেও মূল পাওনা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে না।
মোটরসাইকেল মালিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ
এই সুযোগ শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাণিজ্যিক যানবাহনের জন্য নয়। মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের নিবন্ধিত মোটরযানের মালিক নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী এ সুবিধা নিতে পারবেন।
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেলের ফিটনেস, ট্যাক্স বা অন্যান্য কাগজপত্র সময়মতো হালনাগাদ না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিআরটিএর বর্ধিত সময়সীমা সংশ্লিষ্ট মালিকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিআরটিএ বলছে, এটি শেষ সুযোগ
বিজ্ঞপ্তিতে গ্রাহকদের দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে বিআরটিএ। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শেষবারের মতো সুযোগ দিয়ে আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে মোটরযানের সব কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদ করে নেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।
ফলে নির্ধারিত সময়সীমার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শেষ সময়ে বিআরটিএ কার্যালয় বা অনলাইন সেবায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে ভোগান্তির আশঙ্কাও থাকতে পারে।
গাড়ি বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন বাধ্যতামূলক
মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বিআরটিএ।
সংস্থাটি এর আগে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, কোনো ব্যক্তি মোটরযান বিক্রির পর নতুন মালিকের নামে যথাসময়ে মালিকানা পরিবর্তন না করলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ২১ ধারা অনুযায়ী, মোটরযান বিক্রয়ের পর মালিকানা পরিবর্তন করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্রেতা গাড়ি বা মোটরযান কিনে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নিজেদের নামে মালিকানা পরিবর্তন করছেন না। অথচ ওই যানবাহন সড়ক ও মহাসড়কে নিয়মিত চলাচল করছে।
এর ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিবন্ধনে থাকা পুরনো মালিক।
পুরনো মালিক কেন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন?
বিআরটিএ জানিয়েছে, মালিকানা পরিবর্তন না হলে সরকারি নথিতে পুরনো ব্যক্তিই মোটরযানটির মালিক হিসেবে থেকে যান। ফলে বিভিন্ন ধরনের কর ও আর্থিক দায় তার ওপর এসে পড়তে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ কারণে পুরনো মালিককে—
- নির্ধারিত অগ্রিম আয়কর
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১৫০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর
- পরিবেশ সারচার্জ
পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অর্থাৎ, বাস্তবে গাড়িটি বিক্রি করে দিলেও সরকারি রেকর্ডে নাম পরিবর্তন না হওয়ায় পুরনো মালিক আর্থিক ও আইনগত জটিলতার মুখে পড়তে পারেন।
মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখন সহজ
মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ ও দ্রুত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে বিআরটিএ।
বর্তমানে অনলাইনে আবেদন করার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিক্রেতার উপস্থিতিতে হ্যান্ড-হেল্ড ডিভাইস ব্যবহার করে বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ যাচাই করা হচ্ছে।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একই দিনেই মালিকানা পরিবর্তনের কার্যক্রম সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে নতুন মালিক বা ক্রেতা ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের জন্যও বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে পারছেন।
মোটরযানের বিভিন্ন সেবা অনলাইনে পেতে বিআরটিএর BSP পোর্টাল ব্যবহার করা যায়।
নিয়ম না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা
মালিকানা পরিবর্তন না করে মোটরযান ব্যবহার অব্যাহত রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছে বিআরটিএ।
সংস্থাটি বলছে, মোটরযান বিক্রির পর দ্রুত নতুন মালিকের নামে নিবন্ধন ও মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। অন্যথায় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এ কারণে শুধু ক্রেতা নয়, বিক্রেতারও দায়িত্ব রয়েছে মোটরযান বিক্রির পর মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা।
২৯ অক্টোবরের আগে মালিকদের যা করতে হবে
মোটরযান মালিকদের এখন কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার দিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে—
প্রথমত, মোটরযানের ফিটনেসের মেয়াদ আছে কি না তা যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ট্যাক্স-টোকেনের বকেয়া রয়েছে কি না তা দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে রুট পারমিটসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বৈধ আছে কি না নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ২৯ অক্টোবরের আগেই হালনাগাদের উদ্যোগ নিতে হবে।
পঞ্চমত, গাড়ি বা মোটরসাইকেল বিক্রি করা থাকলে নতুন মালিকের নামে মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে কি না তা যাচাই করা জরুরি।
কেন এই সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাগজপত্র হালনাগাদ না করলে পরবর্তীতে বিলম্ব ফি ও জরিমানাসহ অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে সড়কে চলাচল করলে আইনগত জটিলতারও আশঙ্কা রয়েছে।
তাই বিআরটিএর বর্ধিত সময়সীমাকে অনেক মালিকের জন্য বকেয়া কাগজপত্র নিয়মিত করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- সময় বাড়ানো হয়েছে: আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত
- সুবিধা: জরিমানা ছাড়াই কাগজপত্র হালনাগাদ
- পরিশোধ করতে হবে: মূল কর ও নির্ধারিত ফি
- প্রযোজ্য: মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের মোটরযান
- হালনাগাদ করা যাবে: ফিটনেস, ট্যাক্স-টোকেন, রুট পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- ড্রাইভিং লাইসেন্স: হালনাগাদ বা নবায়নের সুযোগ রয়েছে
- গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: গাড়ি বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন বাধ্যতামূলক
সব মিলিয়ে, যেসব মোটরযান মালিকের কাগজপত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্স দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ রয়েছে, তাদের জন্য আগামী ২৯ অক্টোবর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। জরিমানা ছাড়াই শুধু মূল কর ও নির্ধারিত ফি দিয়ে কাগজপত্র নিয়মিত করার এই সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিআরটিএ।

