বিআরটিএ তথ্য

বাইক বিক্রি করলেও নাম পরিবর্তন না করায় বিপাকে বিক্রেতা: ই-প্রসিকিউশনের ডিজিটাল ফাঁদে মূল মালিক

রাজধানীতে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের ধরতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ‘ই-প্রসিকিউশন’ বা ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এই আধুনিক প্রযুক্তির সুফল মিললেও, কিছু অসচেতনতার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে, পুরাতন মোটরসাইকেল বিক্রি করার পর যারা দ্রুত মালিকানা পরিবর্তন (Name Transfer) করেননি, তারা এখন অন্যের ভুলের শাস্তি নিজের কাঁধে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি এমনই এক ভুক্তভোগীর ঘটনা সামনে এসেছে। বেশ কিছুদিন আগে ঢাকার এক বাসিন্দার কাছে নিজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি বিক্রি করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ক্রেতা বাইকটির মালিকানা নিজের নামে পরিবর্তন করেননি। বর্তমানে বাইকটি কে চালাচ্ছেন, তার নাম-ঠিকানা বা মোবাইল নম্বরও জানা নেই বিক্রেতার।

গত ১৬ মে, ২০২৬ তারিখে তার মোবাইল ফোনে একটি আদালতের সমন বার্তা (SMS) আসে। সেখানে লেখা রয়েছে— ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় তার বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে একটি সিআর (CR-131/26) মামলা দায়ের করা হয়েছে। আগামী ০২ জুন, ২০২৬ তারিখে তাকে লালবাগের ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছে অবস্থিত ‘স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট’ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করা হতে পারে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিআরটিএ (BRTA) রেকর্ডে এখনও বাইকটি পূর্বের মালিকের নামেই নিবন্ধিত থাকায়, এআই (AI) প্রযুক্তির ক্যামেরা যখনই বাইকটির আইন লঙ্ঘনের ছবি তুলেছে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলাটি মূল মালিকের ফোনে চলে গেছে।

ভুক্তভোগীদের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়:

অনুরূপ সমস্যায় পড়া ভুক্তভোগী এবং ট্রাফিক পুলিশের লালবাগ জোনের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে আইনি উপায়ে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব।

  • ১. প্রথম পদক্ষেপ (আদালতে হাজিরা ও জরিমানা প্রদান): যেহেতু মামলাটি ইতোমধ্যে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলে গেছে, তাই আগামী ২ জুন নির্ধারিত তারিখে লালবাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিপরীত পাশে ফায়ার সার্ভিসের উল্টো দিকে) সশরীরে হাজির হতে হবে। সেখানে নিজের দোষ স্বীকার করে (যেহেতু গাড়িটি কাগজে-কলমে আপনার নামে) নির্ধারিত জরিমানা প্রদান করে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় ওয়ারেন্ট বা আইনি জটিলতা বাড়বে।

  • ২. বিআরটিএ ও ট্রাফিক অফিসে যোগাযোগ: জরিমানা পরিশোধের পর আদালতের সার্টিফাইড কপি বা রশিদ নিয়ে লালবাগ ট্রাফিক পুলিশের উপ-কমিশনার (DC Traffic) কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে বিষয়টি লিখিতভাবে অবগত করতে হবে।

  • ৩. জিডি (General Diary) করা: বাইকটি যে নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছিল (যদি বিক্রয় রসিদ বা স্ট্যাম্পের কপি থাকে) তা উল্লেখ করে নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করে রাখতে হবে। জিডিতে উল্লেখ করতে হবে যে, উক্ত তারিখের পর থেকে গাড়ির যেকোনো দুর্ঘটনা বা আইনি দায়ের জন্য বর্তমান চালক দায়ী থাকবেন।

  • ৪. বিআরটিএ-তে গাড়ির তথ্য লক করা: জিডির কপি এবং বিক্রয় দলিলের কপি নিয়ে বিআরটিএ (BRTA) অফিসে গিয়ে মোটরযান পরিদর্শকের বরাবর আবেদন করতে হবে, যাতে গাড়িটির ডিজিটাল নম্বর প্লেট বা ট্র্যাকিং সাময়িকভাবে ‘লক’ বা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করে দেওয়া হয়। এর ফলে বর্তমান চালক যখনই গাড়িটি নিয়ে রাস্তায় বের হবেন, ট্রাফিক পুলিশ গাড়িটি সনাক্ত করে আটকে দেবে এবং চালক মালিকানা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন।

সচেতনতা বার্তা:

সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ট্রাফিক কর্মকর্তাদের মতে, যেকোনো যানবাহন বিক্রি করার সাথে সাথেই ক্রেতাকে নিয়ে বিআরটিএ অফিসে গিয়ে মালিকানা বদল করা বাধ্যতামূলক। সামান্য অলসতা বা অবহেলার কারণে যেকোনো বড় সড়ক দুর্ঘটনা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় মাথায় নিয়ে আপনাকে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাই “বাইক হস্তান্তরের আগেই নাম পরিবর্তন”— এই নীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আপনার জন্য অতিরিক্ত পরামর্শ (ব্যক্তিগত): যেহেতু ২ জুন (০২.০৬.২০২৬) আপনার মামলার তারিখ, আপনি উক্ত ঠিকানায় গিয়ে আদালতের পেশকার বা সংশ্লিষ্ট জিআরও (GRO) এর সাথে কথা বলে দ্রুত জরিমানা দিয়ে এটি ক্লিয়ার করে ফেলুন। এরপর আর দেরি না করে থানায় একটি জিডি করে রাখুন এবং বিআরটিএ-তে যোগাযোগ করুন, যাতে ভবিষ্যতে এই বাইক দিয়ে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আপনি ফেঁসে না যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *