বাংলাদেশের জমিজমা সংক্রান্ত পুরাতন দলিল ও খতিয়ান—বিশেষ করে সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ান—পড়তে গিয়ে অনেকেই জটিলতার মুখে পড়েন। আধুনিক দশমিক পদ্ধতির পরিবর্তে এসব পুরাতন রেকর্ডে জমির মালিকানার হিস্যা প্রকাশে ব্যবহৃত হয়েছে আনা, গণ্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল। এর সঙ্গে রয়েছে বিশেষ কিছু সাংকেতিক চিহ্ন, যা ভূমি পরিমাপ ও হিস্যার ভাষায় অনেকের কাছে রাকিম নামে পরিচিত।
পুরাতন খতিয়ানে একজন মালিকের অংশ বা হিস্যা বুঝতে হলে শুধু সংখ্যার গাণিতিক সম্পর্ক জানলেই যথেষ্ট নয়; ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্নগুলোও চিনতে হয়। কারণ একই লাইনে বড় থেকে ছোট এককের ধারাবাহিকতায় এসব চিহ্ন বসিয়ে মালিকানার অংশ লেখা থাকতে পারে।
সম্পূর্ণ অংশ ধরা হয় ১৬ আনা
পুরাতন হিস্যা পদ্ধতিতে সাধারণভাবে একটি সম্পূর্ণ মালিকানাকে ১৬ আনা হিসেবে ধরা হয়। এরপর ধাপে ধাপে ছোট এককে হিসাব করা হয়।
হিসাবের মূল কাঠামো হলো—
- ১৬ আনা = ১ সম্পূর্ণ অংশ
- ১ আনা = ২০ গণ্ডা
- ১ গণ্ডা = ৪ কড়া
- ১ কড়া = ৩ ক্রান্তি
- ১ ক্রান্তি = ২০ তিল
অর্থাৎ, কোনো খতিয়ানে কারও হিস্যা ৮ আনা লেখা থাকলে তিনি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির অর্ধেক অংশের মালিক। একইভাবে ৪ আনা হলে এক-চতুর্থাংশ এবং ১২ আনা হলে তিন-চতুর্থাংশ হিস্যা বোঝানো হয়।
আনার সাংকেতিক চিহ্ন কীভাবে পড়বেন?
পুরাতন খতিয়ানে আনার হিস্যা অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতীক বা বাঁকা-সোজা দাগের মাধ্যমে লেখা হয়। বড় অংশ বোঝাতে সোজা খাড়া দাগের ব্যবহার দেখা যায়।
প্রচলিত উদাহরণ অনুযায়ী—
| পরিমাণ | সাংকেতিক চিহ্ন | হিসাব |
|---|---|---|
| ১ আনা | ৴ | ১ আনা |
| ২ আনা | ৵ | ২ আনা |
| ৩ আনা | ৶ | ৩ আনা |
| ৪ আনা | ৷ | ৪ আনা |
| ৫ আনা | ৷৴ | ৪ + ১ |
| ৬ আনা | ৷৵ | ৪ + ২ |
| ৮ আনা | ৷৷ | ৪ + ৪ |
| ১০ আনা | ৷৷৵ | ৮ + ২ |
| ১২ আনা | ৷৷৷ | ৪ + ৪ + ৪ |
| ১৫ আনা | ৷৷৷৶ | ১২ + ৩ |
| ১৬ আনা | ৸ | সম্পূর্ণ অংশ |
তবে পুরাতন খতিয়ানের কপি, অঞ্চল, জরিপকাল এবং লেখার ধরনভেদে প্রতীকের আকৃতিতে পার্থক্য বা অস্পষ্টতা দেখা যেতে পারে। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ জমি বিরোধ বা মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গণ্ডা কীভাবে লেখা হয়?
এক আনার নিচের অংশ হলো গণ্ডা। যেহেতু—
১ আনা = ২০ গণ্ডা,
তাই সাধারণভাবে ১ থেকে ১৯ পর্যন্ত গণ্ডা লেখা হয়।
গণ্ডার ক্ষেত্রে অনেক নথিতে সাধারণ বাংলা সংখ্যা ব্যবহার করা হলেও এটি যে গণ্ডার সংখ্যা, তা বোঝাতে আগে আলাদা ছোট চিহ্ন বা বিভাজক থাকতে পারে।
উদাহরণ—
- ৹৫ = ৫ গণ্ডা
- ৹১২ = ১২ গণ্ডা
অর্থাৎ খতিয়ানের ধারাবাহিক লেখার অবস্থান ও পূর্ববর্তী-পরবর্তী চিহ্ন দেখে বুঝতে হয় সংখ্যাটি গণ্ডা নাকি অন্য কোনো একক।
কড়ার হিসাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন?
গণ্ডার পরের ছোট একক হলো কড়া।
মূল সূত্র অনুযায়ী—
১ গণ্ডা = ৪ কড়া
ফলে ৪ কড়া পূর্ণ হলে তা আবার ১ গণ্ডায় রূপান্তরিত হয়। কড়া সাধারণত ১ থেকে ৩ পর্যন্ত হিসাব করা হয়।
প্রচলিত সাংকেতিক রূপের উদাহরণ—
- ১ কড়া: ৲
- ২ কড়া: ৳
- ৩ কড়া: ৴
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিছু পুরাতন প্রতীকের আকৃতি এককের অবস্থানভেদে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। তাই শুধু চিহ্নের আকৃতি দেখে নয়, সেটি আনার পরে, গণ্ডার পরে নাকি ক্রান্তির আগে বসেছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
ক্রান্তি ও তিলের হিসাব
কড়ার নিচের একক হলো ক্রান্তি।
হিসাব—
১ কড়া = ৩ ক্রান্তি
অর্থাৎ ৩ ক্রান্তি পূর্ণ হলে তা ১ কড়ায় পরিণত হয়। প্রচলিত ব্যাখ্যায়—
- ১ ক্রান্তি = /
- ২ ক্রান্তি = //
এরপর আসে তিল।
হিসাব অনুযায়ী—
১ ক্রান্তি = ২০ তিল
তাই তিল সাধারণত ১ থেকে ১৯ পর্যন্ত হতে পারে। ক্রান্তির পরে স্বাভাবিক বাংলা সংখ্যা লেখা থাকলে নথির বিন্যাস অনুযায়ী সেটি তিল হিসেবে পড়া হতে পারে।
খতিয়ানে সব একক একসঙ্গে কীভাবে লেখা থাকে?
পুরাতন খতিয়ানে মালিকানার হিস্যা সাধারণত বড় একক থেকে ছোট এককের দিকে লেখা হয়।
ক্রমটি হলো—
আনা → গণ্ডা → কড়া → ক্রান্তি → তিল
ধরা যাক, একটি হিস্যা লেখা আছে—
৷৷৴ ৹৭ ৲ // ১০
এটি পর্যায়ক্রমে পড়লে পাওয়া যায়—
- ৷৷৴ = ৯ আনা
- ৹৭ = ৭ গণ্ডা
- ৲ = ১ কড়া
- // = ২ ক্রান্তি
- ১০ = ১০ তিল
অর্থাৎ সম্পূর্ণ হিস্যাটি হবে—
৯ আনা ৭ গণ্ডা ১ কড়া ২ ক্রান্তি ১০ তিল
এই পদ্ধতি বুঝতে পারলে পুরাতন খতিয়ানে একাধিক মালিকের হিস্যা আলাদা করে চিহ্নিত করা তুলনামূলক সহজ হয়।
৮ আনা মানে কত অংশ?
১৬ আনা ভিত্তিক পদ্ধতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব হলো—
- ১৬ আনা = সম্পূর্ণ সম্পত্তি
- ৮ আনা = অর্ধেক
- ৪ আনা = এক-চতুর্থাংশ
- ১২ আনা = তিন-চতুর্থাংশ
- ২ আনা = এক-অষ্টমাংশ
ফলে পুরাতন খতিয়ানে কারও নামের পাশে ৮ আনা হিস্যা থাকলে, প্রাথমিকভাবে সেটি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে ৫০ শতাংশ মালিকানা অংশ নির্দেশ করে।
তবে এখানে মনে রাখতে হবে, হিস্যার অংশ এবং জমির প্রকৃত আয়তন এক বিষয় নয়। মালিকানার হিস্যা নির্ধারণের জন্য ১৬ আনা পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও জমির আয়তন নির্ধারণে স্থানীয় পরিমাপ পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।
কানি-গণ্ডা দিয়ে জমির পরিমাণের হিসাব
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় জমির আয়তন বোঝাতে কানি ও গণ্ডা শব্দের ব্যবহার রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কানির পরিমাণ অঞ্চলভেদে এক নয়।
কিছু এলাকায় প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী—
- ১ গণ্ডা = ২ শতক
- ২০ গণ্ডা = ১ কানি
- ১ কানি = ৪০ শতক
- ৪০ শতক = ০.৪০ একর
এই হিসাবে ১ কানি ৪০ শতক ধরা হয়।
তবে দেশের সব অঞ্চলে একই মান প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামসহ কিছু অঞ্চলে বড় কানি বা স্থানীয় ভিন্ন পরিমাপ পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। কোথাও কোথাও ১ কানি প্রায় ১২০ শতক হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
সেক্ষেত্রে একই শব্দ—‘কানি’ বা ‘গণ্ডা’—ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন জমির পরিমাণ নির্দেশ করতে পারে।
একই খতিয়ানের হিস্যা ও জমির পরিমাপ গুলিয়ে ফেললে বিপত্তি
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরাতন নথি পড়ার সময় সবচেয়ে বেশি ভুল হয় হিস্যার একক এবং জমির আয়তনের একককে এক করে ফেলার কারণে।
যেমন—
১৬ আনা সাধারণত সম্পত্তির মালিকানার পূর্ণ অংশ বোঝায়। অন্যদিকে গণ্ডা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিকানার ভগ্নাংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে, আবার স্থানীয় ভূমি পরিমাপে জমির নির্দিষ্ট আয়তনের একক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
তাই একটি শব্দ কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বুঝতে হবে—
- নথির ধরন দেখে,
- সংশ্লিষ্ট কলামের শিরোনাম দেখে,
- এলাকার প্রচলিত পরিমাপ পদ্ধতি বিবেচনা করে,
- দলিল ও খতিয়ানের অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে।
পুরাতন খতিয়ান পড়ার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
পুরাতন সিএস, এসএ বা আরএস খতিয়ান হাতে পেলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা জরুরি—
প্রথমত, সাংকেতিক চিহ্নের অবস্থান দেখুন। একই ধরনের চিহ্ন কোথায় বসেছে, সেটি একক শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হিস্যার ক্রম মিলিয়ে নিন। সাধারণত বড় একক থেকে ছোট এককের দিকে হিসাব লেখা হয়।
তৃতীয়ত, ১৬ আনা পূর্ণ মালিকানা হিসেবে ধরে হিসাব যাচাই করুন।
চতুর্থত, স্থানীয় কানি বা গণ্ডার মান যাচাই ছাড়া সরাসরি শতক বা একরে রূপান্তর করবেন না।
পঞ্চমত, কেবল অনলাইন কপি বা অস্পষ্ট স্ক্যান দেখে গুরুত্বপূর্ণ মালিকানা সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে কেন প্রয়োজন সঠিক পাঠ?
উত্তরাধিকার, বণ্টন, নামজারি, জমি ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আদালতের ভূমি বিরোধ—সব ক্ষেত্রেই পুরাতন খতিয়ানের হিস্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি চিহ্ন ভুল পড়লে মালিকানার অংশের হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে পুরাতন হাতে লেখা খতিয়ানে কালি, লেখার ধরন এবং স্ক্যানের মানের কারণে প্রতীক অস্পষ্ট থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মৌজার রেকর্ড, মূল খতিয়ান, পর্চা, দলিল, নামজারি রেকর্ড এবং প্রয়োজনে ভূমি আইন বা জরিপ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
পুরাতন খতিয়ান পড়ার ক্ষেত্রে আনা-গণ্ডা-কড়া-ক্রান্তি-তিলের গাণিতিক সম্পর্ক জানা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি ব্যবহৃত রাকিম বা সাংকেতিক চিহ্নের অবস্থান ও প্রেক্ষাপট বোঝা।
সংক্ষেপে হিসাবটি মনে রাখুন—
১৬ আনা = ১ অংশ
১ আনা = ২০ গণ্ডা
১ গণ্ডা = ৪ কড়া
১ কড়া = ৩ ক্রান্তি
১ ক্রান্তি = ২০ তিল
তবে পুরাতন ভূমি রেকর্ডের প্রতীক, স্থানীয় পরিমাপ এবং কানির মান অঞ্চল ও রেকর্ডভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ মালিকানা বা জমির পরিমাণ নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি ভূমি রেকর্ড ও মূল নথির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

