সরকারি চাকুরিজীবীদের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ আর বঞ্চনার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৪/০১/২০২২ তারিখের সেই বিতর্কিত পরিপত্র। এই পরিপত্রের গ্যাঁড়াকলে পড়ে হাজার হাজার কর্মচারী তাদের চাকুরি জীবনে প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেড বা ১০/১৬ বছরের আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই নিয়মটি ২০১৫ সালের পে-স্কেলের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং সাধারণ কর্মচারীদের জন্য এক প্রকার ‘কালো আইন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সমস্যার মূল উৎস: ১০/১৬ বছরের হিসাবের মারপ্যাঁচ
২০১৫ সালের বেতন স্কেলের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একই গ্রেডে ১০ বছর সন্তোষজনক চাকুরির পর একটি এবং পরবর্তী ৬ বছর (মোট ১৬ বছর) পর আরেকটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের ওই বিতর্কিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি কোনো কর্মচারীর মাঝপথে ‘গ্রেড উন্নয়ন’ বা ‘পদোন্নতি’ (সেটি নামমাত্র হলেও) হয়, তবে তার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা ওই নতুন তারিখ থেকে পুনরায় গণনা শুরু হবে।
বাস্তবতা বিশ্লেষণ: একজন কর্মচারীর চাকুরি যদি ১০ বছর পূর্ণ হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, এবং ২০২০ সালে যদি তার পদের গ্রেড উন্নয়ন ঘটে, তবে বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী তাকে ১০ বছরের সুবিধার জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আবার ২০৩০ সালের আগে যদি পুনরায় গ্রেড উন্নয়ন ঘটে, তবে সেই সুবিধা পিছিয়ে যাবে ২০৪০ সাল নাগাদ। অর্থাৎ, পদমর্যাদা বা গ্রেড উন্নয়নের নামে কর্মচারীদের প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধাটি বারবার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
পার্থক্য কোথায়? নতুন বনাম পুরাতন
সবচেয়ে বড় বৈষম্য দেখা দিচ্ছে নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে। যারা ২০৪৫ সালে নতুন যোগদান করবেন, তারা সরাসরি উন্নীত গ্রেডে বেতন পাবেন। অন্যদিকে, যারা ২০-৩০ বছর চাকুরি করেছেন, তারাও গ্রেড উন্নয়নের মারপ্যাঁচে পড়ে একই গ্রেডে অবস্থান করবেন। প্রবীণ চাকুরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন তখন কেবল ‘বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট’ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এতে জ্যেষ্ঠতার কোনো আর্থিক প্রতিফলন ঘটছে না।
কেন এটি কালো আইন ও ৭(১) এর পরিপন্থী?
১. অধিকার হরণ: ২০১৫ সালের পে-স্কেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই ব্যাখ্যা তাকে কার্যত রহিত করে দিয়েছে। ২. অযৌক্তিক শর্ত: গ্রেড উন্নয়ন সরকারের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের কারণে একজন কর্মচারীর ব্যক্তিগত উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা কেন পিছিয়ে যাবে, তার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। ৩. আর্থিক ক্ষতি: ১০ বা ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যে বেতন ধাপ পরিবর্তনের কথা ছিল, সেটি না পাওয়ায় একজন কর্মচারী অবসরে যাওয়ার সময় বিশাল অংকের পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অসন্তোষের দাবানল
দেশের বিভিন্ন সেক্টরের সরকারি কর্মচারীরা মনে করছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়মের বেড়াজালে সাধারণ কর্মচারীদের কোণঠাসা করে রেখেছে। “দুনিয়ার সব কিছুই অর্থ মন্ত্রণালয় বোঝে, বাকিরা কিছুই বোঝে না”—এমন একটি মানসিকতা থেকে এই ধরণের জটিল বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
উপসংহার
গ্রেড উন্নয়ন বা উন্নীত গ্রেড যেকোনো সময় হতে পারে, কিন্তু ১০/১৬ বছরের সুবিধাটি চাকুরিতে যোগদানের তারিখ বা নির্দিষ্ট সময়সীমা অনুযায়ী হওয়া উচিত। অন্যথায়, চাকুরির শেষ বয়সে এসে অনেক কর্মচারীই কোনো উচ্চতর গ্রেড না পেয়েই শূন্য হাতে বা কেবল ইনক্রিমেন্টের ‘গল্প’ নিয়ে অবসরে যেতে বাধ্য হবেন। এই বৈষম্য নিরসনে দ্রুত অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই বিতর্কিত ব্যাখ্যার সংশোধন এখন সময়ের দাবি।