সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ৬ সেপ্টেম্বরকে ঘিরে শেষ মুহূর্তে তা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ৬ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা এখন কম। তবে চলতি সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে এবং সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ১০ সেপ্টেম্বর সামনে এসেছে।
কেন ৬ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা?
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে গেজেট প্রকাশ নয়। অনুমোদনের পরও প্রজ্ঞাপনের খসড়া চূড়ান্ত করা, মুদ্রণ-সংক্রান্ত কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যাচাই এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ একাধিক প্রশাসনিক ও আইনগত ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পে-স্কেলের রেজুলেশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) পাঠানো হয়েছে। সেখানকার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসার পর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এসআরও নম্বরসহ চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের ধাপ আসবে।
অর্থাৎ, গেজেট আটকে আছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং অনুমোদনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলোই সময় নিচ্ছে—সর্বশেষ সংবাদগুলো থেকে এমনটাই প্রতীয়মান হচ্ছে।
১০ সেপ্টেম্বর কি এবার চূড়ান্ত তারিখ?
৬ সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর ১০ সেপ্টেম্বরকে নতুন সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এটিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত সরকারি তারিখ নয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হয়, তার ওপরই প্রকৃত প্রকাশের সময় নির্ভর করছে।
ফলে ১০ সেপ্টেম্বরকে আপাতত ‘সম্ভাব্য তারিখ’ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত। সরকারি প্রজ্ঞাপন হাতে না আসা পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন ইতোমধ্যেই হয়েছে
নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ সরকার ৩১ আগস্ট অনুমোদন করেছে বলে সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য নতুন মূল বেতনগুলো হলো—
| গ্রেড | নতুন মূল বেতন |
|---|---|
| ১ম | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| ২য় | ১,৩২,০০০ টাকা |
| ৩য় | ১,১৩,০০০ টাকা |
| ৪র্থ | ১,০০,০০০ টাকা |
| ৫ম | ৮৬,০০০ টাকা |
| ৬ষ্ঠ | ৭১,০০০ টাকা |
| ৭ম | ৫৮,০০০ টাকা |
| ৮ম | ৪৬,০০০ টাকা |
| ৯ম | ৪৪,০০০ টাকা |
| ১০ম | ৩২,০০০ টাকা |
| ১১তম | ২৫,০০০ টাকা |
| ১২তম | ২৪,৩০০ টাকা |
| ১৩তম | ২৪,০০০ টাকা |
| ১৪তম | ২৩,৫০০ টাকা |
| ১৫তম | ২২,৮০০ টাকা |
| ১৬তম | ২১,৯০০ টাকা |
| ১৭তম | ২১,৪০০ টাকা |
| ১৮তম | ২১,০০০ টাকা |
| ১৯তম | ২০,৫০০ টাকা |
| ২০তম | ২০,০০০ টাকা |
সর্বনিম্ন বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পে-স্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন কাঠামোয় তা ২০ হাজার টাকা হলে বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ মূল বেতনের ওপর বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল বেতন বৃদ্ধি আর হাতে পাওয়া মোট বেতন বৃদ্ধি এক বিষয় নয়। ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, অন্যান্য সুবিধা, কর্তন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর একজন কর্মচারীর প্রকৃত মাসিক প্রাপ্তি নির্ভর করবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকরের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলে বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে, বকেয়া বা এরিয়ার কীভাবে নির্ধারণ হবে এবং নতুন বেতন নির্ধারণের ফিক্সেশন পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবে।
অতএব, গেজেট প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফিক্সেশন, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা কিংবা এরিয়ার সংক্রান্ত হিসাবকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
চাকরিজীবীদের অপেক্ষা আরও বাড়ল
দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় থাকা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ৬ সেপ্টেম্বরকে কেন্দ্র করে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—১০ সেপ্টেম্বর কি সত্যিই গেজেট প্রকাশের দিন হবে, নাকি সেটিও পরবর্তী সম্ভাব্য তারিখে পরিণত হবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সতর্ক ও তথ্যনির্ভর অবস্থান হলো—৬ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা কমেছে; ১০ সেপ্টেম্বর একটি সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে সামনে এসেছে; কিন্তু সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো তারিখকেই চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে এখন আর মূল প্রশ্নটি কেবল ‘অনুমোদন হয়েছে কি না’—তা নয়। অনুমোদন হয়েছে, এখন অপেক্ষা চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের। আর সেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে প্রশাসনিক ও আইনগত আনুষ্ঠানিকতার শেষ ধাপগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ৬ সেপ্টেম্বরের সম্ভাবনা কমে গিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর সামনে এলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাস্তব বার্তা একটাই—গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার অবসান ঘটছে না।
১০ সেপ্টেম্বর সত্যিই সেই কাঙ্ক্ষিত দিন হয় কি না, সেটিই এখন সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

