সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগে কোনো কর্মচারী পিআরএল (Post Retirement Leave/অবসর-উত্তর ছুটি) ভোগরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার কোন কোন আর্থিক সুবিধা পাবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৮ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের যৌথবীমা, মাসিক কল্যাণ অনুদান ও দাফন অনুদান—এসব সুবিধাকে অনেক সময় একই ধরনের অনুদান মনে করা হয়। কিন্তু সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এগুলো আলাদা সুবিধা এবং প্রাপ্যতার শর্তও আলাদা।
পিআরএল অবস্থায় মৃত্যু হলে ৮ লাখ টাকা কি পাওয়া যাবে?
সাধারণভাবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত ‘বেসামরিক প্রশাসনে চাকরিরত অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুবরণ এবং গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ী অক্ষমতাজনিত আর্থিক অনুদান প্রদান নীতিমালা ২০২০ (সংশোধিত)’ অনুযায়ী চাকরিরত অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবারকে ৮ লাখ টাকা এককালীন আর্থিক অনুদানের বিধান রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তথ্যেও ৮ লাখ টাকার অনুদানকে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু-র সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, একজন কর্মচারী যদি ইতোমধ্যে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে পিআরএলে থাকেন, তাহলে তাঁর মৃত্যু সাধারণত ‘চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু’ হিসেবে গণ্য করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৮ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে শুধু পিআরএল অবস্থায় মৃত্যুর কারণে তাঁর স্ত্রীকে ডিসি অফিসের মাধ্যমে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হবে—এমন দাবি সঠিক নয়।
তবে পিআরএল অবস্থায় পরিবার একেবারেই সুবিধাবঞ্চিত নয়
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৮ লাখ টাকা না পেলেও পিআরএল ভোগরত কর্মচারীর পরিবার বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের একাধিক সুবিধা পেতে পারে।
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, চাকরিরত/পিআরএল ভোগরত অবস্থায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার কল্যাণভাতা, যৌথবীমা এবং দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদানের আওতায় আসে।
১. যৌথবীমা—বর্তমানে ৩ লাখ টাকা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অনুদানের হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ২০২৫ বা তার পরে মৃত্যু হলে পিআরএল ভোগরত কর্মচারীর পরিবার সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা যৌথবীমার এককালীন অনুদান পাবে। এর আগে মৃত্যুর ক্ষেত্রে হার ছিল ২ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, পিআরএলে থাকা কর্মচারীর মৃত্যু হলে ৩ লাখ টাকা যৌথবীমা পাওয়া যাবে না—এমন তথ্যও সঠিক নয়। বরং সরকারি কল্যাণ বোর্ডের তথ্যেই পিআরএল অবস্থায় মৃত্যুকে যৌথবীমার আওতায় স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে।
২. মাসিক কল্যাণ অনুদান—মাসে ৩ হাজার টাকা
পিআরএল অবস্থায় কর্মচারীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার মাসিক কল্যাণ অনুদান পাওয়ার যোগ্য হতে পারে।
বর্তমান হার মাসিক ৩,০০০ টাকা। তবে এটি আজীবন বা অনির্দিষ্টকাল দেওয়ার বিষয় নয়। বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু হলে অথবা অবসর গ্রহণের তারিখ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মৃত্যু হলে, পরিবার সর্বোচ্চ ১৫ বছর অথবা অবসরের তারিখ থেকে ১০ বছর—যেটি আগে হয়, সেই সীমার মধ্যে মাসিক কল্যাণ অনুদান পেতে পারে।
২০২৫ সালের ১৯ আগস্টের আগে মৃত্যুর ক্ষেত্রে মাসিক হার ছিল ২,০০০ টাকা; ১৯ আগস্ট ২০২৫ থেকে তা ৩,০০০ টাকা করা হয়েছে।
৩. দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদান—বর্তমানে ৫০ হাজার টাকা
এ ক্ষেত্রেও আগের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান হারের পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সরকারি/বোর্ডের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ৭৫ বছর বয়সের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বাবদ ৫০,০০০ টাকা পেতে পারে। ১৯ আগস্ট ২০২৫-এর আগে এই অনুদানের হার ছিল ৩০,০০০ টাকা।
সুতরাং ৪০ হাজার টাকা দাফন অনুদানের তথ্যটি বর্তমান হারের সঙ্গে মিলছে না।
তাহলে পিআরএল অবস্থায় মৃত কর্মচারীর স্ত্রী কী কী পাবেন?
যদি একজন সরকারি কর্মচারী পিআরএল ভোগরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি মোটামুটি এভাবে দেখা যায়—
| সুবিধা | পিআরএল অবস্থায় মৃত্যু হলে |
|---|---|
| জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৮ লাখ টাকা | ❌ সাধারণভাবে প্রাপ্য নয় |
| কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের যৌথবীমা | ✅ সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা |
| মাসিক কল্যাণ অনুদান | ✅ মাসে ৩,০০০ টাকা, নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী |
| দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদান | ✅ বর্তমানে ৫০,০০০ টাকা, শর্তসাপেক্ষে |
উপরের সুবিধাগুলো একই অনুদান নয়; এগুলোর আলাদা বিধান, আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া রয়েছে।
ডিসি অফিসের ভূমিকা কী?
অনেকেই মনে করেন, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অফিস থেকেই ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বিষয়টি আসলে এভাবে সরল নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অনুদানের আবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়/বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজেই জানিয়েছে যে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার ফরম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়েও পাওয়া যায়।
অন্যদিকে কল্যাণভাতা, যৌথবীমা ও দাফন অনুদান বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের সুবিধা এবং এগুলোর জন্য নির্ধারিত আবেদন পদ্ধতি রয়েছে। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী আবেদন অনলাইনে করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ হার্ড কপি সংশ্লিষ্ট অফিসের মাধ্যমে পাঠানোর বিধান রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এখানে মূল পার্থক্যটি হলো ‘চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু’ বনাম ‘পিআরএল অবস্থায় মৃত্যু’।
চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার আওতায় ৮ লাখ টাকার এককালীন আর্থিক অনুদানের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে পিআরএল অবস্থায় মৃত্যু হলে ৮ লাখ টাকার সেই সুবিধা প্রযোজ্য নয়, কিন্তু বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের নিয়মে পিআরএল কর্মচারীর পরিবার ৩ লাখ টাকা যৌথবীমা, মাসিক ৩ হাজার টাকা কল্যাণ অনুদান এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাই ‘পিআরএলে মারা গেলে কোনো অনুদানই পাওয়া যাবে না’—এ কথাও ভুল। আবার ‘পিআরএলে মারা গেলেও ডিসি অফিসের মাধ্যমে ৮ লাখ টাকা পাওয়া যাবে’—এ দাবিটিও বর্তমান সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নোট: ব্যক্তির চাকরির ধরন, অবসরের ধরন, মৃত্যুর তারিখ, বয়স এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর/প্রতিষ্ঠানের আওতা অনুযায়ী চূড়ান্ত প্রাপ্যতা যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট থেকে কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন অনুদানের হার পরিবর্তিত হয়েছে।

