পে স্কেল নিউজ ২০২৬

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬: অবসরভোগীদের পেনশন পুনর্নির্ধারণে বড় পরিবর্তন, কে কত টাকা পাবেন

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নয়, অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বিদ্যমান নিট পেনশনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ নিট পেনশনের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে অবসরকালীন সুবিধা পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের সরকারি গেজেট তালিকাতেও ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

৩০ জুনের নিট পেনশনই হবে মূল ভিত্তি

নতুন নিয়মে একজন অবসরভোগী বা আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে নিট পেনশন গ্রহণ করছিলেন, সেটিকে ভিত্তি ধরে নতুন নিট পেনশন নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ শুধু পুরোনো মূল পেনশনের অঙ্ক দেখলেই নতুন পেনশন বের করা যাবে না; ৩০ জুনের প্রাপ্য নিট পেনশনের স্ল্যাব অনুযায়ী হিসাব করতে হবে।

নতুন কাঠামোয় পেনশন ও গ্র্যাচুইটির প্রচলিত মূল হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ৫ বছর থেকে ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ক্ষেত্রে প্রচলিত গ্রস পেনশন নির্ধারণের হারও বহাল রয়েছে।

কোন পেনশন কত শতাংশ বাড়বে

নতুন পেনশন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব পেনশনভোগীর জন্য একই হারে বৃদ্ধি দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যমান নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী পাঁচটি স্ল্যাব করা হয়েছে।

৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনবৃদ্ধির হারনতুন ন্যূনতম নিট পেনশননতুন সর্বোচ্চ নিট পেনশন
৯,০০০ টাকা বা কম১০০%১০,০০০ টাকা১৮,০০০ টাকা
৯,০০১–২০,০০০ টাকা৭৫%১৮,০০১ টাকা৩৫,০০০ টাকা
২০,০০১–৩০,০০০ টাকা৬৫%৩৫,০০১ টাকা৪৯,০০০ টাকা
৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা৬০%৪৯,০০১ টাকা৬২,০০০ টাকা
৪০,০০০/৪০,০০১ টাকা ও তদূর্ধ্ব৫৫%৬২,০০১ টাকা৭০,২০০ টাকা

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সর্বনিম্ন শ্রেণির পেনশনভোগীদের জন্য বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ—১০০ শতাংশ। অন্যদিকে উচ্চতর নিট পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ধাপে ধাপে কমে ৫৫ শতাংশে নেমেছে। সর্বোচ্চ নতুন নিট পেনশন নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ২০০ টাকা

উদাহরণ দিয়ে হিসাব

ধরা যাক, কোনো অবসরভোগী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ৮,০০০ টাকা নিট পেনশন পেতেন। তিনি ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির আওতায় পড়বেন। ফলে হিসাব অনুযায়ী তার পুনর্নির্ধারিত পেনশন হবে ১৬ হাজার টাকা, যা ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে।

আবার কারও নিট পেনশন যদি ১৫,০০০ টাকা হয়, তাহলে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাবে তা দাঁড়ায় ২৬ হাজার ২৫০ টাকা।

কেউ যদি ২৫,০০০ টাকা নিট পেনশন পেয়ে থাকেন, ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাবে নতুন অঙ্ক হবে ৪১ হাজার ২৫০ টাকা।

আর ৩৫,০০০ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধিতে হিসাব দাঁড়ায় ৫৬ হাজার টাকা।

অন্যদিকে ৪৫,০০০ টাকা নিট পেনশনের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব ৬৯ হাজার ৭৫০ টাকা হয়।

তবে বাস্তবে পেনশন নির্ধারণের সময় প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধান অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

৭০ হাজার ২০০ টাকার বেশি পেনশন যারা পান

নতুন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কোনো বিদ্যমান পেনশনভোগী ইতোমধ্যে এর চেয়ে বেশি নিট পেনশন পেয়ে থাকলে তার ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান রয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এমন পেনশনভোগীরা ১ জুলাই ২০২৭ তারিখে পরবর্তী বার্ষিক বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান নিট পেনশনই পাবেন।

অর্থাৎ ৭০ হাজার ২০০ টাকা একটি সাধারণ সর্বোচ্চ সীমা হলেও এর বেশি বিদ্যমান পেনশন পাওয়া ব্যক্তির বর্তমান পেনশন তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়নি।

পেনশন শতভাগ একবারে নয়, ধাপে ধাপে

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গ্রাফিকসে অনেক সময় ৫০ শতাংশ → ৭৫ শতাংশ → ১০০ শতাংশ হিসেবে বিষয়টি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে পেনশনের বর্ধিত অংশ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্ল্যাবভেদে আলাদা হার রয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী—

১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬:

  • ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিদ্যমান নিট পেনশনের স্ল্যাবে বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ;
  • ২০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব স্ল্যাবে বর্ধিত অংশের ৪০ শতাংশ দেওয়া হবে।

১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭:

  • ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্ল্যাবে বর্ধিত অংশের ৭৫ শতাংশ;
  • ২০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব স্ল্যাবে বর্ধিত অংশের ৭০ শতাংশ দেওয়া হবে।

১ জুলাই ২০২৭ থেকে:

  • বর্ধিত নিট পেনশনের ১০০ শতাংশ কার্যকর হবে এবং প্রযোজ্য বার্ষিক বৃদ্ধি যুক্ত হবে।

তাই ছবিতে থাকা ৫০%, ৭৫% ও ১০০% ধাপটি সাধারণভাবে বিষয়টি বোঝালেও চূড়ান্ত হিসাবের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং ২০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব—এই দুই স্ল্যাবের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

১ জুলাই ২০২৬ থেকেই কার্যকর

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর পেনশনসংক্রান্ত সুবিধা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ নতুন পেনশন কাঠামোর প্রাপ্যতা ওই তারিখ থেকেই গণ্য হবে।

একই সঙ্গে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির সময় পর্যন্ত যে অতিরিক্ত নিট পেনশন প্রাপ্য হবে, তা বকেয়া হিসেবে পাওয়ার বিধানও নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন কাঠামোর অংশ।

আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও আওতায়

নতুন নিয়ম শুধু নিজে অবসর নেওয়া সরকারি কর্মচারীদের জন্য নয়। আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও নতুন নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণের আওতায় থাকবেন। অর্থাৎ যোগ্যতার শর্ত পূরণকারী পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনকে ভিত্তি ধরে সংশ্লিষ্ট স্ল্যাব অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

অবসরোত্তর ছুটি ও ছুটি নগদায়নেও সুবিধা বহাল

নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে অবসরোত্তর ছুটি ও ছুটি নগদায়নের সুবিধা বাতিল করা হয়নি। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, পাওনা ছুটি থাকলে একজন কর্মচারী অবসরোত্তর ১২ মাস পর্যন্ত ছুটি ভোগ করতে পারবেন।

একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন করার সুবিধাও বহাল রাখা হয়েছে। অবসরকালে প্রাপ্য মূল বেতনের ভিত্তিতে ছুটি নগদায়নের অর্থ নির্ধারণ করা হবে।

বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতায় পরিবর্তন

অবসরভোগীদের জন্য নতুন কাঠামোয় বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—

  • ৫০ বছর পর্যন্ত: ৩,০০০ টাকা
  • ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর: ৪,০০০ টাকা
  • ৬০ থেকে ৭০ বছর: ৫,০০০ টাকা
  • ৭০ বছরের বেশি: ৬,০০০ টাকা

অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে পেনশনভোগীর চিকিৎসা ভাতার অঙ্কও বাড়বে। নতুন পে-স্কেলের বিভিন্ন ভাতা ধাপে কার্যকর করার বিধান রয়েছে; চিকিৎসা ভাতার নতুন কাঠামোও সেই বাস্তবায়ন সূচির সঙ্গে সম্পর্কিত।

পেনশনভোগীদের জন্য মূল পরিবর্তন এক নজরে

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর ফলে অবসরভোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলো হলো—

প্রথমত, ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনকে ভিত্তি করে নতুন পেনশন নির্ধারণ।

দ্বিতীয়ত, সর্বনিম্ন স্ল্যাবে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।

তৃতীয়ত, নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী ১০০%, ৭৫%, ৬৫%, ৬০% ও ৫৫%—এই পাঁচ ধরনের বৃদ্ধির হার নির্ধারণ।

চতুর্থত, নতুন নিট পেনশনের সর্বোচ্চ সীমা ৭০ হাজার ২০০ টাকা।

পঞ্চমত, ৭০ হাজার ২০০ টাকার বেশি বিদ্যমান পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ১ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত বর্তমান নিট পেনশন বহাল রাখার ব্যবস্থা।

ষষ্ঠত, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সুবিধা কার্যকর এবং ধাপে ধাপে শতভাগ বর্ধিত পেনশন বাস্তবায়ন।

সপ্তমত, বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ।

অষ্টমত, ১২ মাস অবসরোত্তর ছুটি এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধা বহাল।

কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন কাঠামোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—পেনশন বৃদ্ধিকে একক হারে না রেখে নিট পেনশনের অঙ্কভিত্তিক স্ল্যাব করা হয়েছে। ফলে কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরভোগীরা তুলনামূলক বেশি শতাংশ বৃদ্ধির আওতায় পড়ছেন, আর বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে কমছে।

সরকারের জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদনের সময়ও অবসরভোগীদের জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সে আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছিল।

শেষ কথা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর ফলে অবসরভোগীদের পেনশন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন কত ছিল—এটাই এখন নতুন পেনশন নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি। এরপর সংশ্লিষ্ট স্ল্যাব অনুযায়ী বৃদ্ধির হার প্রয়োগ করে নতুন নিট পেনশন নির্ধারণ করা হবে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পেনশন-সংক্রান্ত বিভিন্ন চার্টের সঙ্গে চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনের বাস্তবায়ন ধাপে পার্থক্য থাকতে পারে। বিশেষ করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং ২০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব পেনশনের ক্ষেত্রে প্রথম দুই ধাপে প্রদানের হার আলাদা—তাই ব্যক্তিগত পেনশন হিসাব করার সময় গেজেটের বিধান অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *