দেশে ডিজিটাল ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন আরও বাড়াতে বাংলা কিউআর (Bangla QR) কোডভিত্তিক লেনদেনে প্রণোদনার পরিধি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে শুধু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী নয়, ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্যান্য মার্চেন্ট পয়েন্টও নির্ধারিত শর্তে এই প্রণোদনা ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা PSD-2 Circular Letter No. 07-এ এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও একই সার্কুলার লেটার প্রকাশিত হয়েছে।
২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনা
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (NPSB) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া ২ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি যোগ্য বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের বিপরীতে মাসিক ভিত্তিতে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণোদনা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- অ্যাকুয়ারিং প্রতিষ্ঠান: লেনদেনের পরিমাণের ০.১০ শতাংশ
- ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান: লেনদেনের পরিমাণের ০.২০ শতাংশ
অর্থাৎ, ২ হাজার টাকার একটি যোগ্য বাংলা কিউআর লেনদেনে অ্যাকুয়ারিং প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনা হবে ২ টাকা এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনা হবে ৪ টাকা। ফলে সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য মোট প্রণোদনা দাঁড়ায় ৬ টাকা।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অর্থ সরাসরি ক্রেতা বা বিক্রেতার হাতে দেওয়া হবে না। প্রণোদনাটি সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট অবকাঠামোর অ্যাকুয়ারিং ও ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে।
উদাহরণে বিষয়টি সহজভাবে
| বাংলা কিউআর লেনদেন | অ্যাকুয়ারিং প্রতিষ্ঠান ০.১০% | ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০% | মোট |
|---|---|---|---|
| ৫০০ টাকা | ০.৫০ টাকা | ১ টাকা | ১.৫০ টাকা |
| ১,০০০ টাকা | ১ টাকা | ২ টাকা | ৩ টাকা |
| ১,৫০০ টাকা | ১.৫০ টাকা | ৩ টাকা | ৪.৫০ টাকা |
| ২,০০০ টাকা | ২ টাকা | ৪ টাকা | ৬ টাকা |
কারা এই সুবিধার আওতায় আসবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো প্রণোদনার আওতা বাড়ানো।
এর আগে ব্যক্তিগত খুচরা হিসাবের মাধ্যমে অনবোর্ড করা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বিক্রেতা এবং সেবা প্রদানকারী মার্চেন্ট পয়েন্টগুলো এ ধরনের প্রণোদনার আওতায় ছিল।
নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে এর সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্যান্য সব মার্চেন্ট পয়েন্টকেও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স থাকা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআর ব্যবহার করে যোগ্য NPSB লেনদেন সম্পন্ন করলে সংশ্লিষ্ট প্রণোদনা কাঠামোর আওতায় আসবে।
আগস্টের নির্দেশনা প্রতিস্থাপন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলারটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করেনি। বরং ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা PSD-2 Circular Letter No. 03-এর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, আগস্টে চালু করা বাংলা কিউআর লেনদেন উৎসাহিত করার নীতিকে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। নতুন সার্কুলারে পরিবর্তিত অংশ ছাড়া আগের সার্কুলারের অন্যান্য শর্ত ও নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে।
কেন এই উদ্যোগ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানো এবং নগদনির্ভর লেনদেন কমানো। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা ও বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলা কিউআরকে আরও কার্যকর পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এ ধরনের প্রণোদনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক আগে থেকেই বাংলা কিউআরভিত্তিক একটি আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত নথিতেও বাংলা কিউআরকে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্চেন্টদের জন্য কী পরিবর্তন আসছে?
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মার্চেন্টকে কেন্দ্র করে প্রণোদনার কাঠামো ছিল, এখন ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্যান্য মার্চেন্ট পয়েন্টও এর আওতায় আসছে।
এতে দোকান, খুচরা ব্যবসা, বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ বৈধ ট্রেড লাইসেন্সধারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলা কিউআর ব্যবহারের আগ্রহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংক, এমএফএস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP), পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (PSO) ও সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট স্কিমগুলোর জন্য বাংলা কিউআর লেনদেন সম্প্রসারণে একটি আর্থিক উৎসাহ তৈরি হবে।
অক্টোবর থেকে বিস্তৃত সুবিধা
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনাকে অক্টোবর থেকে বিস্তৃতভাবে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে প্রণোদনার হার পরিবর্তন করা হয়নি; মূল পরিবর্তন এসেছে যোগ্য মার্চেন্টের পরিধিতে।
অর্থাৎ, ২ হাজার টাকা পর্যন্ত যোগ্য বাংলা কিউআরভিত্তিক NPSB লেনদেনে আগের নির্ধারিত ০.১০ শতাংশ ও ০.২০ শতাংশ হার বহাল থাকছে, কিন্তু এখন এর আওতায় আরও বেশি মার্চেন্ট আসবেন।
ডিজিটাল লেনদেনে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলা কিউআর হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবার গ্রাহকরা কিউআর কোড স্ক্যান করে মার্চেন্টকে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এর আন্তঃপরিচালনযোগ্যতার কারণে একই ধরনের কিউআর অবকাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক ও মার্চেন্টকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
নতুন প্রণোদনার ফলে তিনটি ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে—
প্রথমত, মার্চেন্টের পরিধি বাড়বে। ট্রেড লাইসেন্সধারী আরও ব্যবসায়ী বাংলা কিউআর ব্যবহারে আগ্রহী হতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়বে। কারণ যোগ্য লেনদেনের বিপরীতে অ্যাকুয়ারিং ও ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক প্রণোদনা থাকছে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ছোট অঙ্কের দৈনন্দিন কেনাকাটায় বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল লেনদেন আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে প্রণোদনার প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে মার্চেন্ট অনবোর্ডিং, গ্রাহকের ব্যবহার, পেমেন্ট অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির ওপর।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর PSD-2 Circular Letter No. 07 মূলত বাংলা কিউআর লেনদেনের বিদ্যমান প্রণোদনা ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত করেছে। ২ হাজার টাকা পর্যন্ত যোগ্য প্রতিটি বাংলা কিউআরভিত্তিক NPSB লেনদেনে অ্যাকুয়ারিং প্রতিষ্ঠান ০.১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০ শতাংশ প্রণোদনা পাবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মার্চেন্টের পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্যান্য মার্চেন্ট পয়েন্টও এই কাঠামোর আওতায় আসছে।
এর ফলে দেশে বাংলা কিউআরভিত্তিক ছোট অঙ্কের ডিজিটাল লেনদেন আরও সম্প্রসারিত করার জন্য ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিস্তৃত মার্চেন্ট নেটওয়ার্ককে যুক্ত করার নতুন সুযোগ তৈরি হলো।

