জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একই সঙ্গে নতুন পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হলে কোনটি আগে হিসাব করতে হবে?
বিশেষ করে যেসব কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ধাপ ভুলভাবে প্রয়োগ হলে পরবর্তী বেতন নির্ধারণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
আপনার দেওয়া তথ্য এবং ২০২৬ সালের বেতন আদেশের সংশ্লিষ্ট বিধান মিলিয়ে বিষয়টি ধাপে ধাপে বোঝা যায়।
প্রথমে মূল বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর বিধান অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রথমে বেতন নির্ধারণ (Pay Fixation) করতে হবে এবং এরপর ১ জুলাইয়ের বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি/ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে। গেজেটের সংশ্লিষ্ট বিধানে বলা হয়েছে, প্রথমে বেতন নির্ধারণ করে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি প্রদেয় হবে।
অর্থাৎ সাধারণ ক্ষেত্রে ক্রমটি হবে—
৩০ জুনের মূল বেতন → নতুন পে-স্কেলে পে ফিক্সেশন → ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট → চূড়ান্ত বেতন।
তবে ১ জুলাই একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হলে বিষয়টি আরও নির্দিষ্টভাবে দেখতে হবে।
১ জুলাই উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হলে কী হবে?
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী স্থায়ী কর্মচারী একই পদে পদোন্নতি ছাড়া আট বছর পূর্ণ করলে নবম বছরে ওই পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার যোগ্য হবেন। ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে আট বছর পূর্ণ হলেও ১০ বছর পূর্ণ হয়নি—এমন কর্মচারীদের জন্যও ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হওয়ার বিশেষ বিধান রয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার আগে ৩০ জুনের অবস্থানটি নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারী যে পদ/গ্রেডে ছিলেন এবং যে মূল বেতন পেতেন, সেটিই নতুন বেতন নির্ধারণের ভিত্তি।
তাহলে ধাপগুলো কী হবে?
সহজভাবে বিষয়টি এভাবে সাজানো যায়—
ধাপ–১: ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন নির্ধারণ
প্রথমে দেখতে হবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারীর প্রকৃত মূল বেতন কত ছিল।
এখানে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বা অন্যান্য ভাতা যোগ হবে না। পে ফিক্সেশনের ভিত্তি হলো মূল বেতন।
নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ৩০ জুনের মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট গ্রেড এবং ওই গ্রেডের নতুন বেতনক্রম বিবেচনা করতে হয়।
ধাপ–২: ১ জুলাই ২০২৬-এর নতুন পে-স্কেলে পে ফিক্সেশন
এরপর ৩০ জুনের বেতনের ভিত্তিতে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
সাধারণ হিসাবের ক্ষেত্রে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ থেকে ৩০ জুনের মূল বেতনের পার্থক্য বের করে সেটি নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে যোগ করা হয়। যোগফল নতুন স্কেলের কোনো ধাপে না থাকলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, ৩০ জুনের মূল বেতন যদি ১৩,৭৯০ টাকা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ ১২,৫০০ টাকা হয়, তাহলে পার্থক্য—
১৩,৭৯০ – ১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা।
নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ ২৫,০০০ টাকা হলে—
২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা।
যেহেতু ২৬,২৯০ টাকা নতুন স্কেলের কোনো নির্ধারিত ধাপ নয়, তাই পরবর্তী ধাপ ২৬,৩০০ টাকা হবে।
ধাপ–৩: পে ফিক্সেশনের পর ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই।
গেজেটের বিধান অনুযায়ী, প্রথমে বেতন নির্ধারণ করে তারপর ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি দিতে হবে।
সুতরাং শুধু পুরোনো স্কেলের ৩০ জুনের বেতন ধরে আগে ইনক্রিমেন্ট যোগ করে তারপর নতুন পে-স্কেলে ফিক্সেশন করার পদ্ধতি সঠিক ক্রম নয়।
আগে নতুন স্কেলে ফিক্সেশন, পরে ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট।
ধাপ–৪: ১ জুলাই উচ্চতর গ্রেডের হিসাব
এখন আসছে প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—উচ্চতর গ্রেডটি কোথায় আসবে?
এখানে সাধারণ পে ফিক্সেশন এবং উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণকে আলাদা ধাপ হিসেবে দেখতে হবে।
iBAS++-এর বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত নির্দেশনাতেও বলা হয়েছে, একাধিক বেতন নির্ধারণী সুবিধার মধ্যে যেটি আগে প্রাপ্য, সেটির বেতন নির্ধারণ ও প্রতিপাদন আগে সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়া উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে আগের কোনো বেতন নির্ধারণী সুবিধা অনলাইনে এন্ট্রি হয়ে থাকলে সেটি প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন/বাতিল করে সঠিক ক্রমে উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণ করতে হয়।
তাই ১ জুলাইয়ের উচ্চতর গ্রেড, পে ফিক্সেশন ও ইনক্রিমেন্ট—তিনটি বিষয় একই তারিখে প্রাপ্য হলে শুধু “এক লাইনে আগে-পরে” না দেখে সংশ্লিষ্ট বিধান ও iBAS++-এর fixation sequence অনুসরণ করাই নিরাপদ।
একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে
“আগে ইনক্রিমেন্ট, পরে উচ্চতর গ্রেড”—এই কথাটি সাধারণভাবে সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
কারণ জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৯(২)-এর কাঠামো স্পষ্টভাবে বলছে—
প্রথমে বেতন নির্ধারণ, এরপর ১ জুলাইয়ের বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি।
অন্যদিকে ১ জুলাই উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হলে উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণের নিজস্ব বিধানও প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ ৩০ জুনের বেতনকে ভিত্তি করে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেড এবং ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট—কোনটি fixation sequence-এ আগে বসবে, সেটি সংশ্লিষ্ট উচ্চতর গ্রেডের বিধান ও iBAS++-এর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী করতে হবে।
তাহলে কর্মচারীরা কী করবেন?
১ জুলাই ২০২৬ তারিখে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হলে নিচের তথ্যগুলো আগে প্রস্তুত রাখা ভালো—
১. ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন
২. ৩০ জুনে কার্যকর গ্রেড ও ধাপ
৩. নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেড
৪. ১ জুলাই ২০২৬-এর উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্যতার অফিস আদেশ/যোগ্যতার তথ্য
৫. ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তথ্য
৬. পূর্বে পাওয়া কোনো উচ্চতর গ্রেড/টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেডের তথ্য
৭. iBAS++-এ সংশ্লিষ্ট fixation option-এ সঠিকভাবে তথ্য এন্ট্রি।
সংক্ষেপে পুরো হিসাব
৩০ জুন ২০২৬-এর বেতন
⬇️
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী পে ফিক্সেশন
⬇️
১ জুলাই ২০২৬ প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের বিধান প্রয়োগ
⬇️
প্রযোজ্য নিয়মে ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
⬇️
চূড়ান্ত মূল বেতন
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে: ১ জুলাই একই দিনে একাধিক সুবিধা প্রাপ্য হলে শুধু মুখে মুখে “ইনক্রিমেন্ট আগে” বা “উচ্চতর গ্রেড আগে” ধরে হিসাব না করে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ এবং iBAS++-এর fixation sequence অনুসরণ করতে হবে। কারণ সরকারি iBAS++ নির্দেশনাতেও আগে প্রাপ্য সুবিধার বেতন নির্ধারণ আগে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
শেষ কথা
আপনার দেওয়া প্রশ্নের মূল বক্তব্যের মধ্যে “আগে পে ফিক্সেশন, পরে ইনক্রিমেন্ট”—এই অংশটি জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ১ জুলাই উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু “আগে ইনক্রিমেন্ট, পরে উচ্চতর গ্রেড” বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতার তারিখ, ৩০ জুনের গ্রেড ও মূল বেতন এবং iBAS++-এর নির্ধারিত fixation sequence—এই তিনটি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ সবচেয়ে নিরাপদ নিয়ম হলো: ৩০ জুনের অবস্থান দিয়ে হিসাব শুরু → নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ → প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের বিধান প্রয়োগ → বিধি অনুযায়ী ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট।

