জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। প্রকাশিত হিসাবচিত্রে ২০১৫ সালের পুরোনো বেতনক্রমের প্রতিটি ধাপের বিপরীতে ২০২৬ সালের নতুন বেতনক্রম এবং ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট মূল বেতন কত হতে পারে, তার ধাপভিত্তিক হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুযায়ী নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে একজন কর্মচারী শুধু নিজের গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক বেতনই পাবেন—বিষয়টি এমন নয়। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর প্রকৃত মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, সংশ্লিষ্ট গ্রেড এবং পুরোনো বেতনক্রমের ধাপ বিবেচনা করেই নতুন মূল বেতন নির্ধারণ হবে।
ছবির চার্টে কী দেখানো হয়েছে
প্রকাশিত চার্টটির শিরোনামেই বলা হয়েছে, এটি ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য। এখানে মূলত তিন ধরনের তথ্য পাশাপাশি রাখা হয়েছে—
- বর্তমান বেতন—অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে গৃহীত মূল বেতন;
- ৩০/০৬/২০২৬-এর বেতনভিত্তিক ধাপ;
- ০১/০৭/২০২৬ তারিখে একটি ইনক্রিমেন্টসহ নতুন মূল বেতন।
চার্টের নিচের নোটেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ‘বর্তমান বেতন’ বলতে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে গৃহীত বেতন বোঝানো হয়েছে।
এ কারণে নতুন পে-স্কেলে নিজের বেতন বের করার সময় শুধু ২০২৬ সালের নতুন স্কেলের প্রথম ধাপ দেখলে হবে না। ৩০ জুনের মূল বেতনটি কোন ধাপে ছিল এবং ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট প্রযোজ্য হলে সেটি কত দাঁড়ায়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একই গ্রেডে সবার নতুন বেতন এক হবে না
নতুন পে-স্কেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই গ্রেডে কর্মরত দুজন কর্মচারীর নতুন মূল বেতন একই নাও হতে পারে। কারণ একজন কর্মচারী একই পদে দীর্ঘদিন থেকে একাধিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকতে পারেন, অন্যজন হয়তো তুলনামূলক নতুন।
অর্থাৎ গ্রেড একই হলেও ৩০ জুনের মূল বেতন আলাদা হলে পে-ফিক্সেশনের ফলও আলাদা হতে পারে। সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে প্রকাশিত ব্যাখ্যাতেও এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
পে-ফিক্সেশনের মূল সূত্র কী?
নতুন বেতন নির্ধারণে মূলত দুটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
১. পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন থাকলে
কোনো কর্মচারী যদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর পুরোনো বেতনক্রমের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন পেয়ে থাকেন, তাহলে নতুন স্কেলেও সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, ১৬তম গ্রেডের পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ৯ হাজার ৩০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় ওই গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে থাকা কর্মচারীর নতুন মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা নির্ধারিত হওয়ার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
২. পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের ওপরে বেতন থাকলে
এক্ষেত্রে হিসাবটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে—
৩০ জুনের মূল বেতন – পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন = পার্থক্য
এরপর ওই পার্থক্য নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করা হবে।
যদি পাওয়া অঙ্কটি নতুন বেতনক্রমের কোনো নির্ধারিত ধাপের সঙ্গে মিলে যায়, সেটিই নতুন মূল বেতন হবে। আর যদি কোনো ধাপের সঙ্গে সরাসরি না মেলে, তাহলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।
একটি বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একজন কর্মচারীর ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন ছিল ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা। তাঁর পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
তাহলে—
১৩,৭৯০ – ১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা
নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন যদি ২৫ হাজার টাকা হয়, তাহলে—
২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা
কিন্তু নতুন বেতনক্রমে ২৬ হাজার ২৯০ টাকা নামে কোনো ধাপ না থাকায় পরবর্তী উচ্চতর ধাপ ২৬ হাজার ৩০০ টাকা হবে। সরকারি বেতন নির্ধারণের ব্যাখ্যায় এমন উদাহরণই দেওয়া হয়েছে।
১১–২০ গ্রেডে কেন চার্টটি গুরুত্বপূর্ণ
১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোয় প্রারম্ভিক মূল বেতন তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য হারে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১১তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ এবং ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
তবে এই শতাংশ বৃদ্ধিকে সরাসরি প্রত্যেক কর্মচারীর হাতে পাওয়া নতুন মূল বেতন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ ইনক্রিমেন্টসহ ৩০ জুনের প্রকৃত বেতনই পে-ফিক্সেশনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এই কারণেই চার্টে পুরোনো বেতনক্রমের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে নতুন স্কেলের ধাপ মিলিয়ে দেখানো হয়েছে।
১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ
চার্টটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতনের হিসাব দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ ৩০ জুনের বেতন দেখে সরাসরি নতুন বেতন ধরে নিলে কোনো কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। ১ জুলাইয়ের প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট নতুন ধাপ নির্ধারণ করতে হবে।
তাই ব্যক্তিগত পে-ফিক্সেশন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিষয় পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন—
৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন → ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট → নতুন পে-স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ।
৫ অক্টোবর থেকে পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম
এদিকে নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম ৫ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সম্পন্ন করার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি iBAS++-এর পে-ফিক্সেশন মডিউলের মাধ্যমে করার কথা রয়েছে।
পে-ফিক্সেশনের সময় কর্মচারীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বর্তমান মূল বেতন, পূর্ববর্তী পে-ফিক্সেশন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পদোন্নতি, বদলি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্য যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
ভুল তথ্য থাকলে আটকে যেতে পারে পে-ফিক্সেশন
পে-ফিক্সেশনের ফলের ওপরই পরবর্তী সময়ে নতুন বেতন এবং বকেয়া অর্থের হিসাব তৈরি হবে। ফলে অনলাইনে থাকা তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চাকরির নথির মিল থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে—
- বর্তমান গ্রেড;
- ৩০ জুনের মূল বেতন;
- ইনক্রিমেন্টের তথ্য;
- পূর্ববর্তী পে-ফিক্সেশন;
- পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড;
- টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড;
- যোগদানের তারিখ
এসব তথ্যের কোনো অসংগতি থাকলে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
বর্ধিত বেতন একবারে শতভাগ নয়
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিধান রয়েছে। প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০–২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তা ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বর্ধিত বেতনের ১০০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার কথা।
ফলে চার্টে দেখানো নতুন মূল বেতন এবং কোনো নির্দিষ্ট মাসে বাস্তবে পরিশোধিত মোট বেতন—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।
বকেয়া নিয়েও হিসাব হবে পে-ফিক্সেশনের ভিত্তিতে
নতুন বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ায় জুলাই থেকে প্রাপ্য বকেয়া বা এরিয়ারও পে-ফিক্সেশনের ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পে-ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর হিসাব অনুযায়ী প্রায় তিন মাসের এরিয়ার একসঙ্গে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। তবে প্রত্যেক কর্মচারীর বকেয়া সমান হবে না; গ্রেড, পুরোনো মূল বেতন, নতুন নির্ধারিত মূল বেতন ও কার্যকর তারিখ অনুযায়ী তা হিসাব হবে।
শেষ কথা
১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রকাশিত এই চার্টটি মূলত ৩০ জুনের পুরোনো বেতন, নতুন বেতনক্রম এবং ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্টের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার একটি ধাপভিত্তিক হিসাবচিত্র। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজের গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক বেতন দেখেই চূড়ান্ত বেতন ধরে নেওয়া যাবে না।
৩০ জুন ২০২৬-এর প্রকৃত মূল বেতন, প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন বেতনক্রম মিলিয়েই চূড়ান্ত পে-ফিক্সেশন নির্ধারিত হবে। আর অক্টোবরের পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমে iBAS++-এ প্রদর্শিত তথ্যের সঙ্গে চাকরির মূল নথি মিলিয়ে দেখা তাই কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

