জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫: ২০ গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট চার্ট প্রকাশ, কোন গ্রেডে কত টাকা করে বাড়ত মূল বেতন?
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো বুঝতে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চার্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই চার্টে ২০টি গ্রেডের প্রতিটির জন্য নির্ধারিত প্রারম্ভিক মূল বেতন, সর্বোচ্চ মূল বেতন এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধির ধারাবাহিক ধাপ তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে কোন গ্রেডে একজন কর্মচারী কত বছর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার পর সর্বোচ্চ মূল বেতনে পৌঁছাতে পারেন, তা চার্ট থেকে সহজেই বোঝা যায়।
প্রকাশিত চার্টটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোয় সব গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের ধাপ সমান ছিল না। কোনো গ্রেডে ছিল মাত্র চারটি ধাপ, আবার কোনো কোনো গ্রেডে ছিল ১৮টি ধাপ। ফলে গ্রেডভেদে একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির সময়কাল এবং সর্বোচ্চ মূল বেতনে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ইনক্রিমেন্ট চার্টে কী রয়েছে?
প্রাপ্ত জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ইনক্রিমেন্ট চার্টে ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির বিস্তারিত হিসাব দেওয়া হয়েছে। এখানে প্রতিটি গ্রেডের নির্ধারিত বেতন স্কেলের পাশাপাশি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পর মূল বেতন কত হবে, তা ধারাবাহিকভাবে দেখানো হয়েছে।
চার্টে মোট ১৮টি ইনক্রিমেন্ট ধাপের কলাম রয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডে ১৮টি ধাপ কার্যকর ছিল না। সংশ্লিষ্ট গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতনসীমায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ইনক্রিমেন্টের ধাপ শেষ হয়েছে।
এখানে উল্লেখিত টাকার পরিমাণগুলো মূল বেতন বা Basic Pay। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, টিফিন ভাতা, শিক্ষা সহায়ক ভাতা কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এর অন্তর্ভুক্ত নয়।

২০ গ্রেডে মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্টের বিস্তারিত চিত্র
চার্ট অনুযায়ী ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোয় গ্রেডভিত্তিক প্রারম্ভিক ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
| গ্রেড | প্রারম্ভিক মূল বেতন | সর্বোচ্চ মূল বেতন |
|---|---|---|
| ১ম | ৭৮,০০০ | ৭৮,০০০ |
| ২য় | ৬৬,০০০ | ৭৬,৪৯০ |
| ৩য় | ৫৬,৫০০ | ৭৪,৪০০ |
| ৪র্থ | ৫০,০০০ | ৭১,২০০ |
| ৫ম | ৪৩,০০০ | ৬৯,৮৫০ |
| ৬ষ্ঠ | ৩৫,৫০০ | ৬৭,০১০ |
| ৭ম | ২৯,০০০ | ৬৩,৪১০ |
| ৮ম | ২৩,০০০ | ৫৫,৪৬০ |
| ৯ম | ২২,০০০ | ৫৩,০৬০ |
| ১০ম | ১৬,০০০ | ৩৮,৬৪০ |
| ১১তম | ১২,৫০০ | ৩২,২৪০ |
| ১২তম | ১১,৩০০ | ২৭,৩০০ |
| ১৩তম | ১১,০০০ | ২৬,৫৯০ |
| ১৪তম | ১০,২০০ | ২৪,৬৮০ |
| ১৫তম | ৯,৭০০ | ২৩,৪৯০ |
| ১৬তম | ৯,৩০০ | ২২,৪৯০ |
| ১৭তম | ৯,০০০ | ২১,৮০০ |
| ১৮তম | ৮,৮০০ | ২১,৩১০ |
| ১৯তম | ৮,৫০০ | ২০,৫৭০ |
| ২০তম | ৮,২৫০ | ২০,০১০ |
সূত্র: ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ইনক্রিমেন্ট চার্ট, পৃষ্ঠা ১।
কোন গ্রেডে কতটি ইনক্রিমেন্ট ধাপ ছিল?
চার্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সব গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট ধাপ সমান নয়। গ্রেডভিত্তিক ধাপের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে নিচের চিত্র পাওয়া যায়।
| গ্রেড | ইনক্রিমেন্ট ধাপ |
|---|---|
| ১ম | নির্ধারিত বেতন, ইনক্রিমেন্ট নেই |
| ২য় | ৪টি |
| ৩য় | ৭টি |
| ৪র্থ | ৯টি |
| ৫ম | ১১টি |
| ৬ষ্ঠ | ১৩টি |
| ৭ম | ১৬টি |
| ৮ম | ১৮টি |
| ৯ম–২০তম | ১৮টি |
অর্থাৎ, ২য় গ্রেডে চারটি ইনক্রিমেন্টের পর সর্বোচ্চ মূল বেতনে পৌঁছানো সম্ভব ছিল। অন্যদিকে ৮ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত চার্টে ১৮টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ দেখানো হয়েছে। ১ম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা হওয়ায় সেখানে কোনো ইনক্রিমেন্ট ধাপ নেই।
গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্টের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ
১. ২য় গ্রেড: মাত্র চারটি ইনক্রিমেন্ট ধাপ
২য় গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৬৬ হাজার টাকা। বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে মূল বেতন দাঁড়ায়—
-
প্রারম্ভিক বেতন: ৬৬,০০০ টাকা
-
১ম ধাপ: ৬৮,৪৮০ টাকা
-
২য় ধাপ: ৭১,০৫০ টাকা
-
৩য় ধাপ: ৭৩,৭২০ টাকা
-
৪র্থ ধাপ: ৭৬,৪৯০ টাকা
অর্থাৎ চারটি ইনক্রিমেন্টের পর এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৬ হাজার ৪৯০ টাকায় পৌঁছায়।
২. ৫ম গ্রেড: ১১টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ
৫ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৪৩ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা। এই গ্রেডে মোট ১১টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ রয়েছে।
৩. ৮ম গ্রেড: ১৮টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ
৮ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৩ হাজার টাকা। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ৪৬০ টাকায় পৌঁছায়।
৪. ১০ম গ্রেড: ১৮টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ
১০ম গ্রেডের বেতন স্কেল ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা। প্রথম ইনক্রিমেন্টের পর মূল বেতন ১৬ হাজার ৮০০ টাকা এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ ধাপে মূল বেতন দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা।
৫. ২০তম গ্রেড: সর্বনিম্ন বেতন স্কেলের দীর্ঘ ইনক্রিমেন্ট ধারা
২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এই গ্রেডে ১৮টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ রয়েছে। প্রথম ইনক্রিমেন্টের পর বেতন হয় ৮ হাজার ৬৭০ টাকা। পরবর্তী ধাপগুলো অতিক্রম করে সর্বশেষ ধাপে মূল বেতন দাঁড়ায় ২০ হাজার ১০ টাকা।
ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে হলুদ রঙের ঘরের তাৎপর্য কী?
চার্টে একটি বিশেষ বিষয় লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি গ্রেডের সর্বশেষ ইনক্রিমেন্টের ঘর হলুদ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই হলুদ ঘর মূলত সংশ্লিষ্ট গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতনের ধাপ নির্দেশ করে। অর্থাৎ একজন কর্মচারী নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট পেতে পেতে যখন ওই হলুদ ঘরে পৌঁছাবেন, তখন তিনি সংশ্লিষ্ট গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন অর্জন করবেন।
এরপর একই বেতন স্কেলে নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে আর মূল বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে উচ্চতর গ্রেড বা অন্য কোনো বিধিসম্মত বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকলে সেটি আলাদা বিষয়।
২০১৫ সালের ইনক্রিমেন্ট কাঠামোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
চার্ট বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, গ্রেডভেদে ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা ভিন্ন। উচ্চতর গ্রেডের কয়েকটিতে তুলনামূলক কম ইনক্রিমেন্ট ধাপ থাকলেও নিম্নতর গ্রেডের ক্ষেত্রে ১৮টি পর্যন্ত ধাপ রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইনক্রিমেন্টের পরিমাণ নির্দিষ্টভাবে এক রকম ছিল না। চার্টের ধারাবাহিক বেতন পর্যায়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি ধাপে মূল বেতনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সব গ্রেডে টাকার অঙ্কে বৃদ্ধির পরিমাণ সমান ছিল না।
তৃতীয়ত, সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারিত ছিল। প্রতিটি গ্রেডের জন্য একটি সর্বোচ্চ সীমা ছিল। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে সেই সীমায় পৌঁছালে সংশ্লিষ্ট বেতন স্কেলের ধাপ শেষ হয়ে যেত।
চতুর্থত, ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ওপর প্রভাব ফেলত। মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতার হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারত। তবে সংশ্লিষ্ট ভাতার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য আলাদা বিধি ও হার বিবেচনা করতে হতো।
২০১৫ সালের ইনক্রিমেন্ট চার্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বেতন বৃদ্ধির ইতিহাস এবং বিভিন্ন জাতীয় বেতন স্কেলের তুলনামূলক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের এই চার্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের সময় আগের বেতন স্কেলের ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা, প্রারম্ভিক মূল বেতন, সর্বোচ্চ মূল বেতন এবং ধাপভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে মনে রাখতে হবে, এখানে বিশ্লেষণ করা চার্টটি জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর। এটি ২০২৬ সালের বেতন কাঠামোর ইনক্রিমেন্ট চার্ট নয়। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট নতুন প্রজ্ঞাপন ও বেতন নির্ধারণের বিধান আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
শেষ কথা
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ইনক্রিমেন্ট চার্ট থেকে স্পষ্ট হয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি শুধু বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কের বিষয় ছিল না; বরং প্রতিটি গ্রেডের জন্য নির্ধারিত বেতনসীমা এবং ইনক্রিমেন্টের ধাপের ওপরও নির্ভরশীল ছিল।
বিশেষ করে ২০টি গ্রেডের মধ্যে কোথাও চারটি, কোথাও ১৮টি ইনক্রিমেন্ট ধাপ থাকার বিষয়টি বেতন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাই ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর সঙ্গে পরবর্তী বেতন স্কেলের তুলনা করতে গেলে এই ইনক্রিমেন্ট চার্টকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।





আপনার মন্তব্য