দেশের অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব ফিরিয়ে আনতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন গভর্নর মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এই বিশাল প্যাকেজটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজটিকে প্রধানত দুটি উৎসে ভাগ করা হয়েছে—
পুনঃঅর্থায়ন তহবিল: ৪১,০০০ কোটি টাকা (ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে ৩ বছর মেয়াদে এই তহবিল গঠিত হবে)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল: ১৯,০০০ কোটি টাকা (যার বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি প্রদান করবে)।
১. পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (৪১,০০০ কোটি টাকা) এর খাতওয়ারি বরাদ্দ:
এই তহবিলের আওতায় মূলত শিল্প, কৃষি এবং উৎপাদনশীল খাতের বিভিন্ন শাখায় সহজ শর্তে ও নির্দিষ্ট সুদে ঋণ বিতরণ করা হবে। এর সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নিম্নরূপ:
বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সচল করতে: ২০,০০০ কোটি টাকা।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (CMSME): ৫,০০০ কোটি টাকা।
কৃষি খাত: ১০,000 কোটি টাকা।
রপ্তানিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে: ৩,০০০ কোটি টাকা।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন: ৩,০০০ কোটি টাকা।
২. বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল (১৯,০০০ কোটি টাকা) এর খাতওয়ারি বরাদ্দ:
সরকারের সরাসরি গ্যারান্টিযুক্ত এই তহবিলটি দেশের উদীয়মান, পরিবেশবান্ধব এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতগুলোর সুরক্ষায় ব্যয় করা হবে:
প্রি-শিপমেন্ট খাত: ৫,০০০ কোটি টাকা।
সিএসএমই (CMSME) খাত: ৫,০০০ কোটি টাকা।
চামড়া পণ্য ও জুতা রপ্তানি: ২,০০০ কোটি টাকা।
হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি: ২,০০০ কোটি টাকা।
বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি: ১,০০০ কোটি টাকা।
গ্রামীণ অর্থনীতি প্রণোদনা: ১,০০০ কোটি টাকা।
গ্রিন ইকো-ফ্রেন্ডলি তহবিল: ১,০০০ কোটি টাকা।
বিদেশে কর্মসংস্থান খাত: ১,০০০ কোটি টাকা।
স্টার্ট-আপ (Startup): ৫০০ কোটি টাকা।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: ৫০০ কোটি টাকা।
মূল উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো— বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করা, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি জাতীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা।
এই প্যাকেজটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো হলো:
শিল্প ও সেবা খাত আশানুরূপ চাঙ্গা হবে।
বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও রিজার্ভ শক্তিশালী হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জিডিপি (GDP) অর্জন ত্বরান্বিত হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ দেশের ব্যবসায়িক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে। তবে এই বিশাল তহবিলের সঠিক ও স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
