ভূমি জরিপ বা রেকর্ড প্রস্তুত করার সময় মাঠ পর্যায়ে যে প্রাথমিক ল্যান্ড রেকর্ড বা খসড়া দেওয়া হয়, তাকেই বলা হয় ‘মাঠ পর্চা’। এটি মূলত চূড়ান্ত খতিয়ানের পূর্বরূপ। চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশের আগে এটিই শেষ সুযোগ নিজের জমির মালিকানা ও তথ্য নিখুঁতভাবে যাচাই করে নেওয়ার। এই সময়ে মাঠ পর্চায় কোনো ধরনের ভুল থেকে গেলে ভবিষ্যতে জমি নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তাই মাঠ পর্চা হাতে পাওয়ার পর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞ ও ভূমি সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি মাঠ পর্চা হাতে পাওয়ার পর প্রধানত ৫টি বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত:
১. নাম, পিতার নাম ও ব্যক্তিগত পরিচয় যাচাই
মাঠ পর্চায় জমির মালিকের নাম, পিতার নাম এবং ঠিকানা সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কিনা তা অক্ষরের বানানসহ নিখুঁতভাবে মিলিয়ে নিতে হবে। সামান্য একটি বানানের ভুলও ভবিষ্যতে জমির মালিকানা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
২. দাগ ও খতিয়ান নম্বর নিশ্চিত করা
পর্চায় উল্লেখিত দাগ নম্বর এবং খতিয়ান নম্বর আপনার মূল দলিল বা জমির ম্যাপের (নকশা) সাথে মিলছে কিনা তা শতভাগ নিশ্চিত করুন। ভুল দাগ নম্বরের কারণে আপনার জমির অবস্থান কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে সংশোধন করা বেশ কঠিন।
৩. জমির পরিমাণ ও হিস্যার সঠিকতা
দলিল অনুযায়ী আপনার ঠিক যতটুকু জমি পাওয়ার কথা, মাঠ পর্চায় ঠিক ততটুকু শতাংশ বা অংশ উল্লেখ আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে অংশীদারিত্ব বা ওয়ারিশি (উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত) জমির ক্ষেত্রে হিস্যার সঠিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. জমির সঠিক শ্রেণি নির্ধারণ
আপনার জমিটি ঠিক কী প্রকৃতির— তথা “ভিটি”, “নাল”, “ডোবা” নাকি “আবাদি”, তা পর্চায় সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কিনা খেয়াল করুন। জমির শ্রেণি ভুলভাবে নথিভুক্ত হলে জমির সরকারি মূল্য (মৌজা রেট) এবং বাৎসরিক ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনার পরিমাণে বড় ধরনের তারতম্য ও লোকসান হতে পারে।
৫. চৌহদ্দি ও মন্তব্য অংশ পর্যবেক্ষণ
পর্চার পেছনের পাতায় বা নির্দিষ্ট কলামে কোনো বিশেষ মন্তব্য, জমির বিরোধ, মামলা কিংবা কোনো বিশেষ টীকা রয়েছে কিনা তা ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। একই সাথে জমির উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের সীমানা বা চৌহদ্দি ঠিক আছে কিনা তাও মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তথ্য ভুল থাকলে তাৎক্ষণিক করণীয়
যদি মাঠ পর্চায় কোনো ভুলত্রুটি ধরা পড়ে, তবে তা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে জরিপ চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমি আইন অনুযায়ী, জরিপ চলাকালে মাঠ পর্চার ভুলের বিরুদ্ধে ৩০ ধারা বা ৩১ ধারায় আপত্তি (Objection) জানানোর সুযোগ থাকে।
সতর্কতা: জরিপ শেষ হয়ে একবার চূড়ান্ত খতিয়ান বা গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে, তা সংশোধন করা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়।
ভূমি সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ— জমি আপনার অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ, তাই এর প্রাথমিক নথিপত্র বা মাঠ পর্চা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই অবহেলা করা যাবে না। জরিপ কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে উপস্থিত থাকাকালীনই সব তথ্য যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
