দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভায় পে কমিশনের জনপ্রশাসন সংক্রান্ত সুপারিশ নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো সংক্রান্ত সুপারিশ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সভা-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত কাঠামো প্রায় প্রস্তুত। যদিও কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে এবং কত ধাপে তা কার্যকর হবে—এ বিষয়ে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জনপ্রশাসন খাতের সুপারিশে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সচিব কমিটির বৈঠকে পে কমিশনের জনপ্রশাসন সংক্রান্ত সুপারিশগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর এসব সুপারিশের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো, পদমর্যাদা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন হওয়ায় এ দুটি খাতের সুপারিশ আপাতত চূড়ান্ত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
১ জুলাই থেকে শুরু হতে পারে বাস্তবায়ন
সরকার ইতোমধ্যে আগামী ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই পে স্কেল কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, বেতন নির্ধারণ (পে ফিক্সেশন), সফটওয়্যার আপডেট এবং বাজেট বরাদ্দের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। ফলে চাকরিজীবীরা বর্ধিত বেতনের অর্থ হাতে পেতে অক্টোবর মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে।
এলপিআরভোগীরাও সুবিধা পেতে পারেন
সভা-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে অবসর-পূর্ব ছুটিতে (এলপিআর) থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নবম পে স্কেলের আওতায় আনার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে। বিষয়টি চূড়ান্ত হলে হাজারো এলপিআরভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন এবং তাঁদের অবসরকালীন আর্থিক হিসাবেও এর প্রভাব পড়বে।
বেতন বৃদ্ধির তিনটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা
সভায় বেতন বৃদ্ধির হার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার বর্তমানে তিনটি বিকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছে।
প্রথম প্রস্তাবে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের (বেসিক) ওপর ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।
দ্বিতীয় বিকল্প অনুযায়ী, উচ্চ ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তাদের তুলনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রস্তাবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মরতদের জন্য ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
তৃতীয় ও সবচেয়ে আলোচিত বিকল্প হিসেবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন শতভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন।
নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে স্কেলে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সমান হার প্রয়োগের পরিবর্তে নিম্ন গ্রেডকে বেশি সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বেতন বৈষম্য কিছুটা কমানো এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো।
চূড়ান্ত ঘোষণা এখন সময়ের অপেক্ষা
সচিব কমিটির বৈঠকে নীতিগত অগ্রগতি হলেও এখনো গেজেট প্রকাশ কিংবা বেতন বৃদ্ধির নির্দিষ্ট হার ঘোষণা করা হয়নি। বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী সংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর পুরো প্যাকেজ অনুমোদনের জন্য তা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নবম জাতীয় পে স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো, বেতন বৃদ্ধির হার এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হতে পারে। ফলে প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথ আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
