সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন এই বেতন কাঠামোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই খুশির খবরের সমান্তরালে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায় কিছুটা ‘কাটছাঁট’ করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
গতকাল বুধবার সচিব কমিটির একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে নবম পে স্কেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত ধরে এর আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে সভায় গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় হয়েছে।
মূল বেতন বাড়ছে, সংকুচিত হতে পারে ভাতার পরিধি
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মূল বেতন বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই বিভিন্ন ভাতার পরিমাণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে। এতে সরকারের বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এই চাপ সামাল দিতে এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন ভাতা পুনর্মূল্যায়ন ও সীমিতকরণের আভাস পাওয়া গেছে। এমনকি কার্যকারিতা হারিয়েছে এমন কিছু ছোট ছোট ভাতা সম্পূর্ণ বাতিলও হতে পারে।
বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় ভাতার খাত ‘বাড়িভাড়া’ পুনর্বিবেচনার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বাড়িভাড়ায় নতুন সিলিং ও ভাতার পুনর্বিন্যাস
বর্তমানে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি অঞ্চলভেদে ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন কাঠামোতে মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে বাড়িভাড়ার টাকার অঙ্কও বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, এই ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাড়িভাড়ার বিদ্যমান শতাংশ কিছুটা কমিয়ে একটি নির্দিষ্ট সীমা বা সিলিং নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুধুমাত্র বাড়িভাড়াই নয়, অন্যান্য প্রধান ভাতাগুলোর ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে:
চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা: এই দুটি খাতের ভাতার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সীমা বা নির্দিষ্ট সিলিং নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শিক্ষা সহায়ক ভাতা: সন্তানদের শিক্ষা খরচের ভাতার ক্ষেত্রেও সংস্কার আসতে পারে।
অন্যান্য ভাতা: বর্তমানে উৎসব, বৈশাখী, টিফিন, ধোলাই এবং বিশেষ ভাতাসহ বেশ কিছু সুবিধা চালু রয়েছে। এর মধ্যে কম গুরুত্বপূর্ণ বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্যকারিতা কমে যাওয়া ছোট ছোট ভাতাগুলো বিলুপ্তির তালিকায় পড়তে পারে।
কেন এই কঠোরতা?
সচিব কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। মূল বেতন বাড়ানোর ফলে যেন সরকারের নগদ প্রবাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়, সেজন্যই ভাতার হার যৌক্তিকীকরণের এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, একদিকে মূল বেতন বাড়িয়ে যেমন জীবনযাত্রার মান উন্নত করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ভাতার লাগাম টেনে বাজেটকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন শেষে দ্রুতই এই নবম পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
