ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা, নামজারি কিংবা মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়— ‘ড্রাফট খতিয়ান’ বা ‘ওয়ার্কিং খতিয়ান’ কী? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনবক্স কিংবা কমেন্ট বক্সে প্রতিদিন শত শত মানুষ এই বিষয়টি জানতে চান। বিশেষ করে, এই ড্রাফট খতিয়ান দিয়ে জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তর করা যায় কিনা, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে চরম বিভ্রান্তি।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ড্রাফট খতিয়ান কোনো আলাদা বা নতুন জরিপ খতিয়ান নয়। এটি মূলত আপনার নিকট থাকা প্রচলিত বিভিন্ন জরিপ খতিয়ানের (যেমন: সি এস, পি এস/এস এ, আর এস, বি এস/বি আর এস, এম আর আর কিংবা আর ও আর) সৃষ্টিকালীন আদি তথ্য এবং ধারাবাহিক মালিকানা পরিবর্তনের একটি দালিলিক ইতিহাস। ভূমির নিরবচ্ছিন্ন মালিকানা বা চেইন অব টাইটেল (Chain of Title) প্রমাণে এটি এক অনন্য ও অকাট্য দাপ্তরিক নথি।
ড্রাফট বা ওয়ার্কিং খতিয়ান আসলে কী?
একটি নির্দিষ্ট দাগের জমি আদি মালিক থেকে শুরু করে কীভাবে, কী মূলে বা কার মাধ্যমে ধাপে ধাপে বর্তমান মালিকের নামে রেকর্ডভুক্ত হলো—তার নিখুঁত বিবরণীই হলো ড্রাফট বা ওয়ার্কিং খতিয়ান। সরকারি বালাম বই বা মূল নথিতে এটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ থাকে।
দলিল মূলে মালিকানা পরিবর্তন: জরিপ চলাকালীন যদি দেখা যায় কোনো জমির পূর্ববর্তী মালিকানা পরিবর্তন হয়ে অন্য একজনের নামে রেকর্ড হয়েছে, তবে তা মাঝখানের একটি দলিলের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। ড্রাফট খতিয়ানে ঠিক ওই দলিলের আদি তথ্য, যেমন— দলিলের নম্বর, সম্পাদনের তারিখ এবং রেজিস্ট্রি অফিসের বিবরণ সুন্দরভাবে উল্লেখ থাকে। সেখানে লেখা থাকে “দলিল মূলে মালিক, দলিল নং……”।
মামলার রায় বা ডিক্রি মূলে মালিকানা: অনেক সময় দেখা যায়, পূর্বপুরুষদের আমলে কোনো জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা চলছিল। পরবর্তীতে আদালতের রায় বা ডিক্রি যার পক্ষে এসেছে, তার নামেই পরবর্তী জরিপে রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে ড্রাফট খতিয়ানে সেই মামলার ঐতিহাসিক রায়, মামলার নম্বর, ডিক্রির তারিখ এবং আদালতের বিবরণ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকে।
একে কেন জমির ‘জন্মসনদ’ বলা হয়?
একজন মানুষের পরিচয় ও বংশলতিকা যেমন তার জন্মসনদ বা পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঠিক তেমনি একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের বা জমির মালিকানার আদি উৎস, বিবর্তন এবং বর্তমান রূপ জানতে এই ড্রাফট খতিয়ানের বিকল্প নেই। সরকারি বালামে লিপিবদ্ধ এই আদি তথ্যের কারণেই আইনজ্ঞ ও ভূমি বিশেষজ্ঞরা ড্রাফট খতিয়ানকে জমির ‘জন্মসনদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। কোনো জমিতে আপনার পূর্বপুরুষের প্রকৃত স্বত্ব বা अधिकार ছিল কিনা, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে এই খতিয়ান এক চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
ড্রাফট খতিয়ান দিয়ে কি জমি ক্রয়-বিক্রয় করা যায়?
উত্তর হচ্ছে— স্পষ্ট ‘না’। ড্রাফট বা ওয়ার্কিং খতিয়ান জমি কেনাবেচা, বন্ধক রাখা কিংবা সরাসরি হস্তান্তরের কোনো মূল দলিল বা চূড়ান্ত রেকর্ড নয়। এটি কোনো স্বত্ব বা মালিকানা সরাসরি তৈরি করে না, বরং মালিকানার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে। আপনি এই খতিয়ান আদালত বা ভূমি অফিসে উত্তোলন করে আপনার জমির প্রকৃত মালিকানা দাবি (Claim) করতে পারবেন এবং যেকোনো জটিল বিরোধে নিজের স্বত্ব প্রমাণ করতে পারবেন। তবে কেবল এই খতিয়ানের ওপর ভিত্তি করে কোনো সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জমি বিক্রয়ের দলিল সম্পাদন করা সম্ভব নয়। জমি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য অবশ্যই চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত গেজেটভুক্ত রেকর্ডীয় খতিয়ান (যেমন আর এস বা বি এস) এবং হালনাগাদ নামজারি (মিউটেশন) পর্চা আবশ্যক।
তাহলে কি এই ড্রাফট খতিয়ান সর্বত্র পাওয়া যায়?
বাস্তবতা হলো, সব অঞ্চলের বা সব জরিপের ড্রাফট খতিয়ান চাইলেই সহজে পাওয়া যায় না। কিছু নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং জরিপের ওয়ার্কিং খতিয়ান এখনও সরকারি আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। তবে এই খতিয়ানগুলোর কপি সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং সাধারণ খতিয়ানের তুলনায় এর দাপ্তরিক ও আনুষঙ্গিক খরচ অনেক বেশি হয়ে থাকে।
ড্রাফট খতিয়ান কোথায় পাবেন?
যদি আপনার জমির মালিকানা নিয়ে বড় ধরনের কোনো বিরোধ থাকে এবং এই বিশেষ খতিয়ানটির প্রয়োজন পড়ে, তবে আপনি পর্যায়ক্রমে নিম্নলিখিত স্থানগুলোতে যোগাযোগ করতে পারেন:
নিজ জেলার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (DC Office): প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করে আবেদন করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট জেলার রেকর্ড রুম (Record Room): ডিসি অফিসের মহাফেজখানা বা রেকর্ড রুমে পুরনো বালাম তল্লাশি করে এটি খুঁজে বের করতে হয়।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (DLRS): যদি স্থানীয় জেলা পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে এই রেকর্ড খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকার তেজগাঁওস্থিত কেন্দ্রীয় ‘ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর’-এ যোগাযোগ করে আদি বালামের অনুলিপি সংগ্রহ করতে হবে।
বিশেষ বার্তা: ভূমি সংক্রান্ত সঠিক ও তথ্যভিত্তিক জ্ঞান রাখা আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। না জেনে বা না বুঝে কোনো বিষয়ে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য বা অপপ্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।
বিস্তারিত জানতে এবং জরুরি প্রয়োজনে ড্রাফট খতিয়ানের সহায়তার জন্য—
সরাসরি ইনবক্স করুন অথবা হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) করুন: 01950050629
এই ডাউনলোডেবল পিডিএফ ফাইলের বৈশিষ্ট্য:
পেশাদার লেআউট: একটি পরিচ্ছন্ন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিউজ ফরম্যাটে ডিজাইন করা।
কালার স্কিম: একটি মার্জিত গাঢ় সবুজ (Deep Green) এবং সোনালী (Gold) থিম ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভূমি ও আইন সংক্রান্ত রিপোর্টের জন্য অত্যন্ত মানানসই।
সহজপাঠ্য বিন্যাস: গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে আলাদা হাইলাইট বক্স এবং ক্রমানুসারে সাজানো তালিকার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যাতে পাঠক এক নজরে মূল বিষয়গুলো বুঝতে পারেন।
