সরকারি চাকরিজীবী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পন্ন হয়েছে। নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতন পাবেন। তবে ভাতা সংক্রান্ত সুবিধাগুলো মিলবে আগামী অর্থবছরের (১ জুলাই থেকে) শুরু থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ সংক্রান্ত আবহ তৈরি হলেও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এগোচ্ছে।
গত সোমবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে ‘ইনোভেশন শোকেসিং ২০২৫-২৬’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে উপস্থিত অর্থমন্ত্রীর কাছে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের শেষ সিদ্ধান্ত কী—তা জানতে চাওয়া হলে তিনি এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য বা জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে অর্থমন্ত্রী মুখ না খুললেও অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কমিটির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফাইলটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের অপেক্ষা
সূত্রমতে, অন্তত এক সপ্তাহ আগেই নতুন বেতনকাঠামোর যাবতীয় খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিচার বিভাগের বেতনকাঠামো নিয়ে কিছু কারিগরি জটিলতা থাকলেও ইতিমধ্যে সেগুলোর সমাধান সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল অর্থমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা স্বাক্ষরের অপেক্ষা। অর্থমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেলেই বিষয়টি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। এটি আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে অথবা তার পরবর্তী বৈঠকে পেশ করা হতে পারে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার পর প্রজ্ঞাপন জারির আগে নিয়ম অনুযায়ী আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার (ভেটিং) জন্য ফাইলটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
বাজেটে বরাদ্দ ও খরচের হিসাব
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ এবার ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অঙ্কটি বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব বেশি বড় নয়।
তবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের মূল আভাস লুকিয়ে আছে বাজেটের অন্য খাতে। বাজেটের ‘পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সম্পদের ব্যবহার’ অংশের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে এবার রেকর্ড ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি (৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা)।
অর্থ বিভাগের অভ্যন্তরীণ তথ্য: জনপ্রশাসন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের এই বিপুল অঙ্কের মধ্য থেকে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের নতুন বেতনকাঠামো ও বর্ধিত সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই রিজার্ভ বা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
দুই ধাপে বাস্তবায়ন
কমিটির সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, নতুন কাঠামোটি দুই ধাপে কার্যকর হবে। অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে সরকার এই কৌশল নিয়েছে:
প্রথম ধাপ: চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হবে বর্ধিত ‘মূল বেতন’ (Basic Salary)।
দ্বিতীয় ধাপ: পরবর্তী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের সাথে যুক্ত হবে নতুন কাঠামোর ‘ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা’।
সব মিলিয়ে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হলেই পরিষ্কার হবে কার বেতন কত টাকা বাড়ছে।
