সরকারি নিউজ আপডেট

জিপিএফের অতিরিক্ত অর্থ কি সুদ? সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক

সরকারি চাকরিজীবীদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) থেকে অবসরের সময় জমাকৃত অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত যে অর্থ বা মুনাফা দেওয়া হয়, সেটি ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদ কি না—এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা, মতবিরোধ ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা জিপিএফে ন্যূনতম ৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতনের অংশ জমা রাখতে পারেন। পাশাপাশি সরকার সুদ (বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে “মুনাফা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়) গ্রহণের সুযোগ রাখার পাশাপাশি সুদমুক্ত (Interest-free) অপশনও চালু রেখেছে।

বিতর্কের মূল কারণ

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো—জমাকৃত অর্থের অতিরিক্ত অংশটি আদৌ সুদ কি না।

একটি পক্ষের দাবি, যেহেতু সরকার বর্তমানে সুদ গ্রহণ বা না নেওয়ার বিকল্প (Yes/No Option) রেখেছে, তাই অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করলে সেটি সুদ হিসেবেই গণ্য হবে। তাদের মতে, সুদমুক্ত অপশন বিদ্যমান থাকায় ধর্মীয়ভাবে সতর্ক ব্যক্তিদের সুদমুক্ত স্কিমই বেছে নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে আরেকটি পক্ষের যুক্তি, ন্যূনতম ৫ শতাংশ কর্তন সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় এটি স্বেচ্ছায় বিনিয়োগ নয়। ফলে এই অর্থের বিপরীতে সরকার যে অতিরিক্ত অর্থ দেয়, সেটিকে ক্ষতিপূরণ বা সরকারি সুবিধা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা কয়েকজন ইসলামী গবেষকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, বাধ্যতামূলক কর্তনের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রচলিত সুদের সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে না।

আলেমদের মধ্যেও রয়েছে মতপার্থক্য

এ বিষয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যেও একক মত নেই।

একটি মত অনুসারে, বাধ্যতামূলকভাবে কাটা ন্যূনতম ৫ শতাংশের বিপরীতে পাওয়া অর্থকে প্রচলিত সুদের আওতায় ফেলা ঠিক নয়। তবে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত অর্থ জমা দিয়ে তার বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে বাড়তি অর্থ গ্রহণ করলে সেটি সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

অন্যদিকে অনেক আলেমের অভিমত, যেহেতু সরকার সুদমুক্ত বিকল্প রেখেছে, তাই অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়।

আবার কিছু আলেমের মতে, রাষ্ট্রীয় পেনশন ও জিপিএফের কাঠামো প্রচলিত ব্যাংক ঋণ বা ব্যক্তিগত সুদের লেনদেনের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। তাই বিষয়টি ইজতিহাদভিত্তিক (গবেষণানির্ভর) এবং একাধিক মত বিদ্যমান।

সরকারি ব্যবস্থায় কী রয়েছে?

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা জিপিএফ চালুর সময় অথবা পরবর্তীতে আবেদন করে সুদমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। যারা সুদ গ্রহণ করতে চান না, তারা লিখিত আবেদন করলে ভবিষ্যতে জমাকৃত অর্থের ওপর অতিরিক্ত মুনাফা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারেন।

অন্যদিকে যারা আবেদন করেন না, তারা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ পান।

সামাজিক মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ে শত শত মন্তব্য দেখা গেছে। কেউ বলছেন, “সুদ তো সুদই, নাম পরিবর্তন করলেই তা বৈধ হয় না।” আবার কেউ বলছেন, “বাধ্যতামূলক কর্তনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া অর্থকে সুদ বলা যায় না।”

কিছু চাকরিজীবী মত দিয়েছেন, যেহেতু বিষয়টি ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিভিন্ন আলেমের মত ভিন্ন, তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যের ওপর নির্ভর না করে বিশ্বস্ত আলেম বা নিজ অনুসৃত মাযহাবের বিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ নেওয়াই অধিক নিরাপদ।

উপসংহার

জিপিএফের অতিরিক্ত অর্থ সুদ কি না—এ প্রশ্নের একক ও সর্বসম্মত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত বর্তমানে নেই। বিভিন্ন ইসলামী গবেষক ও আলেম ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে সরকারি ব্যবস্থায় সুদমুক্ত বিকল্প বিদ্যমান থাকায় যারা ধর্মীয় কারণে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণে অনাগ্রহী, তারা আবেদন করে সুদমুক্ত জিপিএফ চালু রাখতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমের তর্কের পরিবর্তে প্রামাণ্য ফতোয়া ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ অনুসরণ করাই উত্তম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *