সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকেই নতুন পে-স্কেল একবারেই কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। যদিও আগে এটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা ছিল, শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা এড়াতে এক ধাপেই বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোমবার অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হবে। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন। এ বৈঠকেই বিভিন্ন গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
কেন এক ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত?
সূত্র বলছে, শুরুতে সরকার নতুন পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। কিন্তু এতে আইবাস (iBAS++) অনলাইন বেতন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একই সঙ্গে দুই ধাপে বেতন নির্ধারণ ও সমন্বয়ের কারণে প্রশাসনিক ব্যয় এবং কারিগরি জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া দুই ধাপে বাস্তবায়ন করলে চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একবারেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার দিকেই ঝুঁকছে সরকার।
কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কমতে পারে বেতন বৃদ্ধির হার
যদিও নতুন পে-স্কেল এক ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, তবে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত হারে বেতন বৃদ্ধি নাও হতে পারে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বাজেটের চাপ এবং সরকারের আর্থিক ব্যয় বিবেচনায় কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কিছুটা কম হারে বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা চলছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও সরকারের আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আজকের বৈঠকেই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
জানা গেছে, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন গ্রেডে কত শতাংশ বেতন বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পর্যায়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব সরকারের উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।
বর্তমান ও প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো
বর্তমানে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা
অন্যদিকে নবম জাতীয় বেতন কমিশন সুপারিশ করেছে—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা
তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে এই অঙ্কে পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ইঙ্গিত রয়েছে।
কোন গ্রেডে কত বাড়তে পারে?
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আলোচনায় রয়েছে—
- ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
- ১০ম গ্রেড থেকে নিম্ন গ্রেডগুলোতে তুলনামূলক ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তবে এগুলো এখনও চূড়ান্ত নয়; বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বেতন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এক ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলে বেতন নির্ধারণ, সফটওয়্যার সমন্বয় এবং বকেয়া হিসাব নিরসন তুলনামূলক সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ, এই বৈঠকের সুপারিশই নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
