সরকারি চাকরিতে সাময়িক বরখাস্তের সময় একজন কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় সাময়িক বরখাস্ত থাকার পর বিভাগীয় মামলা বা তদন্তের নিষ্পত্তিতে ওই সময়কাল যদি পরবর্তীতে ‘কর্তব্যরত’ (Duty) হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বকেয়া আর্থিক সুবিধা কীভাবে পরিশোধ করা হবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগের স্মারক নং এম,এফ/এফ-ডি (ইমপ্লি)-৪-এফ-বি/১২/৮৪/১১৫, তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫-এর নির্দেশনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট মহলে বিবেচিত হয়ে থাকে। ওই নির্দেশনার আলোকে সাময়িক বরখাস্তের সময়কাল পরবর্তীতে কর্তব্যরত বা নিয়মিত হিসেবে গণ্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বকেয়া আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসে।
সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় কী ঘটে
কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম, তদন্ত কিংবা গুরুতর অভিযোগের কারণে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি হলে তিনি স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এ সময় প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পূর্ণ বেতনের পরিবর্তে নির্ধারিত হারে খোরাকী ভাতা (Subsistence Allowance) পাওয়ার বিধান থাকতে পারে।
ফলে সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে কর্মচারীর নিয়মিত বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে উৎসব ভাতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে পরবর্তীতে বিভাগীয় তদন্ত বা আপিলের মাধ্যমে যদি ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয় এবং সাময়িক বরখাস্তের সময়কালকে কর্তব্যরত হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন ওই সময়ের আর্থিক সুবিধাগুলো পুনর্নির্ধারণের প্রশ্ন আসে।
সময়কাল ‘কর্তব্যরত’ হিসেবে গণ্য হলে কী হবে
অর্থ বিভাগের ১৯৮৫ সালের নির্দেশনার আলোকে মূল বিষয়টি হলো—সাময়িক বরখাস্তের সময়কাল পরবর্তীতে যদি এমনভাবে নিষ্পত্তি করা হয় যে ওই সময়কে কর্তব্যরত হিসেবে গণ্য করা হবে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রাপ্য বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ, সাময়িক বরখাস্তের কারণে যে সময়টিতে পূর্ণ বেতন-ভাতা পাওয়া যায়নি, পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেই সময়ের প্রাপ্যতা পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়।
এ ক্ষেত্রে শুধু বেতন নয়, সংশ্লিষ্ট সময়ের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিধিসম্মত আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।
বকেয়া উৎসব ভাতার বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি কর্মচারীরা বিধি অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু কোনো কর্মচারী যদি উৎসবের সময় সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় থাকেন, তখন তার উৎসব ভাতা নিয়ে প্রশাসনিক ও হিসাবগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
পরবর্তীতে যদি সেই সাময়িক বরখাস্তকালকে কর্তব্যরত হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে ওই সময়ের প্রাপ্য উৎসব ভাতার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থ বিভাগের উল্লিখিত নির্দেশনা এ ধরনের বকেয়া আর্থিক সুবিধা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ, বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, সময়কাল কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিধি—এসব বিষয় যাচাই করেই চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলেই কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব টাকা পাওয়া যাবে?
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মচারী বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাময়িক বরখাস্তকাল পূর্ণ কর্তব্যকাল হিসেবে গণ্য হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত আদেশে ওই সময়কাল কীভাবে গণনা করা হয়েছে, সেটিই মূল বিষয়। যদি আদেশে সাময়িক বরখাস্তকালকে কর্তব্যরত হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, সময়কালকে অন্য কোনোভাবে নিষ্পত্তি করা হলে আর্থিক সুবিধার হিসাবও সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে।
দীর্ঘমেয়াদি বিভাগীয় মামলায় এর গুরুত্ব
অনেক সময় সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় মামলা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তি না হওয়ায় সাময়িক বরখাস্তের মেয়াদও দীর্ঘ হয়। এতে একদিকে কর্মচারী নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারেন না, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে তার আর্থিক সুবিধার ওপরও প্রভাব পড়ে।
পরবর্তীতে তদন্ত বা আপিলের মাধ্যমে কর্মচারী সম্পূর্ণ অব্যাহতি পেলে কিংবা কর্তৃপক্ষ সাময়িক বরখাস্তকালকে কর্তব্যকাল হিসেবে গণ্য করলে আগের সময়ের আর্থিক হিসাব পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এ কারণে ১৯৮৫ সালের অর্থ বিভাগের নির্দেশনাটি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছে।
হিসাবরক্ষণে কীভাবে বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে
সাময়িক বরখাস্তকাল পরবর্তীতে কর্তব্যরত হিসেবে গণ্য হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সাধারণত চূড়ান্ত আদেশের ভিত্তিতে কর্মচারীর প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হয়। এরপর বেতন-ভাতার পুনঃনির্ধারণ, বকেয়া হিসাব তৈরি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধার হিসাব করা হয়।
এ ধরনের বিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় ও ট্রেজারি কর্তৃপক্ষকে প্রচলিত বিধি এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ অনুসরণ করতে হয়।
কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করণীয়
কোনো কর্মচারী সাময়িক বরখাস্ত থেকে পরবর্তীতে অব্যাহতি বা পুনর্বহাল হলে তার উচিত চূড়ান্ত আদেশটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করা। বিশেষ করে আদেশে সাময়িক বরখাস্তকাল কীভাবে গণনা করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করে বকেয়া বেতন-ভাতা, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধার হিসাব পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি উত্থাপন করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫ সালের অর্থ বিভাগের স্মারকসহ প্রযোজ্য বিধি ও পরবর্তী সরকারি আদেশ যাচাই করা জরুরি। কারণ সময়ের সঙ্গে সরকারি বিধি, পরিপত্র বা আর্থিক আদেশে পরিবর্তন আসতে পারে।
আইনি ও প্রশাসনিক দিক
সাময়িক বরখাস্ত একটি শাস্তিমূলক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; এটি সাধারণত বিভাগীয় কার্যক্রম চলাকালীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই পরবর্তীতে বিভাগীয় কার্যক্রমের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ওই সময়ের চাকরিকাল ও আর্থিক সুবিধার অবস্থান নির্ধারিত হতে পারে।
এ কারণে কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে শুধু সাময়িক বরখাস্তের সময় কী পরিমাণ খোরাকী ভাতা দেওয়া হয়েছিল, সেটিই চূড়ান্ত হিসাব নয়। পরবর্তী চূড়ান্ত আদেশে ওই সময়কাল কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে, তার ওপর বকেয়া পাওনার হিসাব অনেকাংশে নির্ভর করে।
শেষ কথা
সাময়িক বরখাস্তের পর কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরিকালকে পরবর্তীতে কর্তব্যরত হিসেবে গণ্য করা হলে, ওই সময়ের বকেয়া আর্থিক সুবিধা নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫ সালের অর্থ বিভাগের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ একটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে বকেয়া বেতন-ভাতার পাশাপাশি প্রাপ্য উৎসব ভাতার বিষয়টিও তখন সামনে আসে।
তবে এটি কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত আদেশ, সাময়িক বরখাস্তকাল কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে, প্রযোজ্য সার্ভিস রুলস এবং পরবর্তী আর্থিক নির্দেশনা যাচাই করেই বকেয়া নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক অধিকার সংরক্ষণ এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে এ ধরনের পুরোনো অর্থ বিভাগীয় নির্দেশনা তাই এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

