সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার প্রকাশ হওয়ার জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশিত হয়নি। দিনভর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজই প্রজ্ঞাপন জারির খবর ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বিকেল-সন্ধ্যার মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে—এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। কিন্তু রাত পর্যন্ত বহুল প্রতীক্ষিত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশ না হওয়া মানেই নবম পে স্কেল বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যায়ের দিকে রয়েছে।
সকাল থেকে ছড়ায় গেজেট প্রকাশের খবর
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নবম পে স্কেলের গেজেট নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেটিংয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং বাকি আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশের চেষ্টা চলছে। ফলে অনেক চাকরিজীবী ধরে নেন, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজই হয়তো হাতে আসবে নবম পে স্কেলের বহুল প্রতীক্ষিত প্রজ্ঞাপন।
কিন্তু দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় সেই প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।
‘ভেটিং শেষ’ আর ‘গেজেট প্রকাশ’—দুটি এক বিষয় নয়
নবম পে স্কেলের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভেটিংয়ে যাওয়া বা ভেটিং প্রায় শেষ হওয়া মানেই গেজেট প্রকাশ হয়ে যাওয়া নয়।
প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইনগতভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, সংশোধন, স্বাক্ষর, এসআরও নম্বর প্রদান এবং সরকারি মুদ্রণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা থাকতে পারে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য উঠেছে এবং ভেটিংয়ের বড় অংশ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ প্রক্রিয়া এগিয়েছে, কিন্তু গেজেট প্রকাশের চূড়ান্ত ধাপ তখনও সম্পন্ন হয়নি।
কেন এতদিনেও গেজেট প্রকাশ হয়নি?
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় জাতীয় পে স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দেয়—কোথায় আটকে আছে গেজেট?
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আইনগত ভেটিং, বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও সুবিধা সমন্বয়, বিচার বিভাগীয় সার্ভিসের কিছু বিষয় এবং নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-হিসাব ব্যবস্থার প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ এটি শুধু একটি সাধারণ প্রজ্ঞাপন ছাপানোর বিষয় নয়। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বেতন নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও বকেয়া হিসাবের মতো বিষয়গুলোও গেজেটের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
গেজেট না হওয়া পর্যন্ত কোন বিষয়গুলো পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়?
মন্ত্রিসভায় পে স্কেল অনুমোদন একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও চাকরিজীবীরা বাস্তবে কীভাবে নতুন বেতন পাবেন, তার বিস্তারিত নিয়ম জানতে গেজেটের প্রয়োজন।
বিশেষ করে—
- নতুন মূল বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে;
- পুরোনো বেতন থেকে নতুন স্কেলে ফিক্সেশন কীভাবে হবে;
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের নিয়ম কী হবে;
- পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ কীভাবে হবে;
- উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে;
- বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা কীভাবে কার্যকর হবে;
- অবসরপ্রাপ্ত ও অবসরপ্রত্যাশীদের সুবিধা কীভাবে সমন্বয় হবে;
- ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বকেয়া কীভাবে হিসাব করা হবে—
এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনার জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপনই মূল দলিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খসড়া, সূত্রের বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার বিষয়টি কী হবে?
সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও কার্যকর তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর অর্থ হলো, গেজেট যদি পরবর্তী কোনো তারিখে প্রকাশিত হয়, তাহলে গেজেটে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার বিষয়টি সমন্বয় করা হতে পারে। তবে বকেয়া ও বেতন ফিক্সেশনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি গেজেট প্রকাশের পরই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।
আজকের ঘটনায় হতাশা কেন বাড়ল?
মূল কারণ হচ্ছে প্রত্যাশার মাত্রা। কয়েকদিন ধরেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে আসছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে বিষয়টি আরও জোরালো হয়। বিকেলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভেটিংয়ের অগ্রগতি এবং সন্ধ্যার মধ্যে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনার খবর প্রকাশিত হওয়ায় চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়।
ফলে সন্ধ্যার পরও গেজেট না আসায় অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—আবার কি নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হলো?
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। বরং সর্বশেষ তথ্য বলছে, খসড়া ভেটিংয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
আগের পে স্কেলের ইতিহাসও দেরির বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে
২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের ক্ষেত্রেও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সঙ্গে সঙ্গে গেজেট প্রকাশ হয়নি। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ১৫ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল।
অবশ্য আগের অভিজ্ঞতা বর্তমান পে স্কেলের ক্ষেত্রেও একই সময় লাগবে—এমন নিশ্চয়তা দেয় না। তবে এটি দেখায় যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ পর্যন্ত প্রশাসনিক ও আইনগত একাধিক ধাপ থাকতে পারে।
এখন চাকরিজীবীদের নজর কোথায়?
এখন মূল নজর থাকবে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হওয়া এবং এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির দিকে।
১৭ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য উঠেছে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ভেটিংয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছে।
তাই আজ গেজেট না হওয়াকে আপাতত ‘প্রক্রিয়া ব্যর্থ’ হিসেবে নয়, বরং প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শেষ কথা
নবম পে স্কেল নিয়ে আজকের দিনটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ছিল আশা, অপেক্ষা ও শেষ পর্যন্ত হতাশার দিন। সকাল থেকে ‘আজই গেজেট’—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হয়নি।
তবে একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট যে প্রক্রিয়াটি থেমে নেই। বরং ১৭ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ ধাপের দিকে এগিয়েছে।
এখন সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—আর কোনো অনিশ্চয়তা নয়, দ্রুত চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়নের পথ পরিষ্কার করা।

